বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির আকাশে গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রতীক্ষিত নাম তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে আগামী ২৫ ডিসেম্বর এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে তিনি নিজ মাতৃভূমিতে পা রাখতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির এই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রত্যাবর্তনকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কেবল একজন শীর্ষ নেতার দেশে ফেরা হিসেবে দেখছেন না; বরং একে দেখছেন ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় কাঠামো, বিপর্যস্ত জননিরাপত্তা এবং চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা ১৬ কোটি মানুষের ‘আশার আলো’ হিসেবে।
সংকটের দোলাচলে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। গত ৫ আগস্ট দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর দেশ এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের রেশ কাটতে না কাটতেই জনমনে দানা বেঁধেছে চরম শঙ্কা। বিগত এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশে যে ধরণের অস্থিতিশীলতা, মব ভায়োলেন্স এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আস্ফালন দেখা যাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী মহল আজ দিশেহারা। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছে, তা নজিরবিহীন। গত ১৬ মাসে ‘মব জাস্টিস’ বা উগ্রবাদের নামে যে অরাজকতা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা বোধকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
গণমাধ্যম ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাটি মুক্ত সাংবাদিকতার ওপর এক নগ্ন আঘাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একই রাতে ছায়ানট ও উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে, বিশ্লেষকরা তাকে ‘সাংস্কৃতিক মৌলবাদ’ হিসেবে দেখছেন। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে তরুণ নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর পর এই হত্যাকাণ্ডকে পুঁজি করে যেভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে, তা তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রাক্কালে একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরির সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা বলেই মনে করা হচ্ছে।
নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা ও জাতীয় ঐক্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে যে ভয়াবহ নেতৃত্বহীনতা দেখা দিচ্ছে, তা থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য একজন অভিজ্ঞ এবং সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্বের বিকল্প নেই। এই শূন্যতা পূরণে তারেক রহমান আজ জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। গত ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু হোটেলে আয়োজিত মতবিনিময় সভা তার একটি বড় প্রমাণ। সেখানে দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক ও বুদ্ধিজীবীরা উপস্থিত হয়ে তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন। যারা এক সময় তার কট্টর সমালোচক ছিলেন, তারাও আজ দেশের এই সংকটকালে তার প্রজ্ঞা ও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘ দেড় দশকে সব মত ও পথের মানুষকে এক ছাদের নিচে আনতে পারা তারেক রহমানের এক বিশাল রাজনৈতিক বিজয়।
অর্থনৈতিক মুক্তি ও আধুনিক ভিশন
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারায়। ব্যাংকিং খাতের লুটপাট, ডলার সংকট এবং আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এই অচলাবস্থা কাটাতে তারেক রহমান তার ‘৩১ দফা’ সংস্কার প্রস্তাবে আধুনিক বাজার অর্থনীতি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির এক বিস্তারিত রূপরেখা দিয়েছেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি একজন আধুনিক মনস্ক নেতা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন, যিনি মেধাভিত্তিক সমাজ ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক দর্শন
তারেক রহমানের নেতৃত্বের শিকড় প্রোথিত তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এবং মাতা বেগম খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনে দলের ঐক্য ধরে রেখে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, তিনি শহীদ জিয়ার দূরদর্শিতা এবং দেশনেত্রীর সাহসের এক সার্থক সংমিশ্রণ। আজ যখন রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখন মানুষ তারেক রহমানের মধ্যেই সেই ‘ত্রাতা’র রূপ দেখতে পাচ্ছে।
ভূ-রাজনীতি ও সার্বভৌমত্ব
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—তার রাজনীতির মূলমন্ত্র হলো “সবার আগে বাংলাদেশ”। দেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেই তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চান। তার এই ভারসাম্যপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাশীল অবস্থান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটটি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং অস্তিত্বের সংকট। দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের পর অর্জিত স্বাধীনতা যেন কিছু উগ্রবাদী ও ষড়যন্ত্রকারীর হাতে জিম্মি না হয়ে পড়ে—সেই আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ আজ উদ্গ্রীব। ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল হিথ্রো থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছানো নয়, বরং তা বাংলাদেশের অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার এক ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। কোটি মানুষের বিশ্বাস, তার নেতৃত্বে দেশে আবার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মব কালচার বন্ধ হয়ে একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









