১১:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
একটি অবিস্মরণীয় রাজনৈতিক অধ্যায়

বেগম খালেদা জিয়ার তার রবের জিম্মায় চলে গেলেন

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং বিএনপির প্রাণশক্তি বেগম খালেদা জিয়া আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বিএনপি মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি জটিলতাসহ নানাবিধ বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। তাঁর পিতা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মাতা তৈয়বা মজুমদার। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন, যদিও তাঁদের আদি পৈতৃক নিবাস ছিল ফেনী জেলায়। শৈশব ও কৈশোর দিনাজপুরে কাটিয়েছেন তিনি। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

রাষ্ট্রাচার থেকে রাজনীতির ময়দানে

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বেগম জিয়া ফার্স্ট লেডি হিসেবে জনসম্মুখে আসেন। সেই সময় তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে অংশ নিয়ে বিশ্বনেতাদের নজরে আসেন। তবে ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর জীবন আমূল বদলে যায়। দলের প্রয়োজনে এবং নেতাকর্মীদের চাপে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। রাজনীতিতে এসেই তিনি অভাবনীয় নেতৃত্বগুণ প্রদর্শন করেন; ১৯৮৩ সালে দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

সংসদীয় গণতন্ত্র ও রেকর্ড জয়ের নেত্রী

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান। ১৯৯১ সালে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয়লাভ করলে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অনন্য রেকর্ড হলো—তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত হওয়া প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাঁচটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই বিজয়ী হয়েছিলেন। এমনকি ২০০৮ সালের কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তিনি তিনটি আসনে লড়ে তিনটিতেই জয়লাভ করেন। এই রেকর্ড তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অপরাজেয় ও জননন্দিত নেত্রীর আসনে বসিয়েছে।

শেষ দিনগুলো ও বিদায়

বিগত কয়েক বছর বেগম জিয়ার জন্য ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিকূলতাও তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার দাবি বারবার উঠলেও আইনি ও শারীরিক জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। তাঁর প্রয়াণ কেবল একটি দলের ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করল।

দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, তাঁর জানাজার সময় ও দাফন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। এক বর্ণাঢ্য এবং আপসহীন রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে তিনি রয়ে গেলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায়

জনপ্রিয়

একটি অবিস্মরণীয় রাজনৈতিক অধ্যায়

বেগম খালেদা জিয়ার তার রবের জিম্মায় চলে গেলেন

প্রকাশিত : ১২:৩১:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং বিএনপির প্রাণশক্তি বেগম খালেদা জিয়া আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বিএনপি মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং কিডনি জটিলতাসহ নানাবিধ বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। তাঁর পিতা ইস্কান্দার মজুমদার এবং মাতা তৈয়বা মজুমদার। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন, যদিও তাঁদের আদি পৈতৃক নিবাস ছিল ফেনী জেলায়। শৈশব ও কৈশোর দিনাজপুরে কাটিয়েছেন তিনি। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করে পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

রাষ্ট্রাচার থেকে রাজনীতির ময়দানে

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বেগম জিয়া ফার্স্ট লেডি হিসেবে জনসম্মুখে আসেন। সেই সময় তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে অংশ নিয়ে বিশ্বনেতাদের নজরে আসেন। তবে ১৯৮১ সালে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর জীবন আমূল বদলে যায়। দলের প্রয়োজনে এবং নেতাকর্মীদের চাপে ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। রাজনীতিতে এসেই তিনি অভাবনীয় নেতৃত্বগুণ প্রদর্শন করেন; ১৯৮৩ সালে দলের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

সংসদীয় গণতন্ত্র ও রেকর্ড জয়ের নেত্রী

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান। ১৯৯১ সালে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয়লাভ করলে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অনন্য রেকর্ড হলো—তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত হওয়া প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাঁচটি করে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই বিজয়ী হয়েছিলেন। এমনকি ২০০৮ সালের কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও তিনি তিনটি আসনে লড়ে তিনটিতেই জয়লাভ করেন। এই রেকর্ড তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অপরাজেয় ও জননন্দিত নেত্রীর আসনে বসিয়েছে।

শেষ দিনগুলো ও বিদায়

বিগত কয়েক বছর বেগম জিয়ার জন্য ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিকূলতাও তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার দাবি বারবার উঠলেও আইনি ও শারীরিক জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। তাঁর প্রয়াণ কেবল একটি দলের ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি করল।

দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, তাঁর জানাজার সময় ও দাফন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পরবর্তীতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। এক বর্ণাঢ্য এবং আপসহীন রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে তিনি রয়ে গেলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায়