বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ, বর্ণাঢ্য এবং কণ্টকাকীর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। আপনার বিস্তারিত বর্ণনায় তাঁর জীবনের প্রতিটি বাঁক—একজন লাজুক গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে ওঠা, তাঁর ত্যাগ, সংগ্রাম এবং তাঁর ওপর বয়ে যাওয়া নজিরবিহীন প্রতিকূলতার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা এক অনন্য রাজনৈতিক মহাকাব্য।
বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে আজ এক বিশাল নক্ষত্রের পতন হলো। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা আর কোটি মানুষের প্রার্থনাকে পেছনে ফেলে তিনি পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।
১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুল ছিলেন প্রচারবিমুখ ও ধীরস্থির। কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবন বদলে দেয়। স্বামী জিয়াউর রহমান যখন রণাঙ্গনে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন, তখন দুই শিশুপুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ তিনি ছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দি। সেই ৯ মাসের অনিশ্চয়তা ও মানসিক লড়াই তাঁকে পরবর্তী জীবনের কঠিন সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করেছিল। ১৯৮১ সালে স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর যখন বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে, তখন দলের হাল ধরতে তিনি ঘর থেকে রাজপথে বেরিয়ে আসেন।
জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বেগম জিয়া এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে যখন অনেক দল এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গিয়েছিল, তিনি তা বর্জন করে নীতির প্রশ্নে অনড় থাকেন। এই আপসহীনতাই তাঁকে জনমানুষের ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। দীর্ঘ ৯ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং তাঁর নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হয়।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি রাষ্ট্রের কাঠামো বদলে দেন। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন ছিল তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নারী জাগরণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণ, মোবাইল ফোনকে সাধারণের নাগালে আনা এবং পলিথিন নিষিদ্ধকরণের মতো সাহসী পদক্ষেপগুলো তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচয় দেয়।
২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময় যখন তাঁকে দেশত্যাগের জন্য প্রবল চাপ দেওয়া হয়, তিনি পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, “বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই।” তাঁর এই দৃঢ় অবস্থান ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ নস্যাৎ করে দেয়। পরবর্তী ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলে তাঁর ওপর যে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা ইতিহাসের পাতায় কলঙ্কজনক হয়ে থাকবে। স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, কার্যালয়ে ৯৩ দিন অবরুদ্ধ দশা এবং সেই অবরুদ্ধ অবস্থায় ছোট ছেলে কোকোর মৃত্যু সংবাদ পাওয়া—প্রতিটি ঘটনাই ছিল তাঁর হৃদয়ে চরম আঘাত।
২০১৮ সালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় তাঁকে নির্জন কারাগারে পাঠানো হয়। জরাজীর্ণ প্রকোষ্ঠে তাঁর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। লিভার সিরোসিস ও কিডনি জটিলতায় ভোগা সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাঁকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি। কিন্তু তিনি হার মানেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকের পতনের পর তিনি বীরের বেশে মুক্তি পান। মুক্তির পর তাঁর বক্তব্যে কোনো প্রতিহিংসা ছিল না, ছিল দেশ গড়ার আহ্বান।
বেগম খালেদা জিয়া কেবল বাংলাদেশের নেত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এক প্রভাবশালী মহীয়সী। ফোর্বস থেকে শুরু করে টাইম ম্যাগাজিন—সবখানেই তাঁর নেতৃত্বের স্বীকৃতি মিলেছে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর ত্যাগ, সংগ্রাম আর আপসহীনতার মন্ত্র রয়ে গেছে কোটি ভক্তের হৃদয়ে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে তিনি এক ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলবেন, যাঁর আলো কখনো ম্লান হবে না।
“ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়, আসুন ভালোবাসা আর শান্তির সমাজ গড়ে তুলি।” — বেগম খালেদা জিয়া
মাহবুব মুনীর 









