বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতা নতুন কিছু নয়, বরং এটি একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। অতীতে ২০১৪, ২০১৮ সালের নির্বাচন এবং বিশেষ করে ২০০৬-০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সময় মার্কিন, ব্রিটিশ এবং জাতিসংঘের কূটনীতিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণার পর এই কূটনৈতিক তৎপরতা আবার বেড়েছে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের এই ধারাবাহিক বৈঠকের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে, যা সাবেক কূটনীতিকদের মতামতের ভিত্তিতে স্পষ্ট হয়েছে। সদ্য অবসরে যাওয়া একজন রাষ্ট্রদূতের মতে, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিভাজনের সুযোগ নিয়ে বিদেশি কূটনীতিকরা এখানে হস্তক্ষেপের সুযোগ পান। অনেক বিদেশি রাষ্ট্র গণতন্ত্র, সুশাসন এবং মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। যখন কোনো দেশে গণতন্ত্র বা মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হয়, তখন ওইসব দেশের কূটনীতিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে বা অভিযোগ জানাতে বিভিন্ন সময়ে বিদেশি কূটনীতিকদের দ্বারস্থ হয়।বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিভিন্ন দেশের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ বিদ্যমান। প্রভাবশালী দেশগুলো তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী অন্য দেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। অপর সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ এই বৈঠকগুলোকে ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন—রাষ্ট্রদূতরা রাজনৈতিক দলগুলোর চাওয়া বা অবস্থান বোঝার চেষ্টা করেন।
কূটনীতিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়গুলো হলো: অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া।দেশে গণতন্ত্রের অগ্রগতি, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার গুরুত্ব।চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনা ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নেওয়া।কয়েকটি বৈঠকে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।
অতীতের তুলনায় এবার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশের কূটনীতিকরা ছোট-বড় অনেক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), রাশিয়া, জার্মানি, চীন, সুইজারল্যান্ড, পাকিস্তান এর কুটনীতিকদের সাথে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, নরওয়ে, ডেনমার্ক, তুরস্ক (উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী), সুইজারল্যান্ড, ইতালি, আলজেরিয়া, ইইউ এর কুটনীতিকদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করে চলেছেন।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দেশের সমসাময়িক রাজনীতি, সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়ে ঐকমত্যের অগ্রগতি এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনা,গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশের আগামীর পথচলা সহ সংশ্লিষ্ট প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্র (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত), যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ফিলিস্তিন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানির কুটনীতিকদের সাথে।
পাশাপাশিগণঅধিকার পরিষদ, জাতীয় পার্টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি) এবং আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম স্থগিত) নেতা সাবের হোসেন চৌধুরী কুটনীতিকদের সাথে বৈঠক করেছেন। যদিও সাবের হোসেন চৌধুরীর সাথে নরডিক অঞ্চলের তিন দেশের রাষ্ট্রদূতের বৈঠক নিয়ে নানা গুঞ্জন চলমান আছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো সম্পর্কে বিদেশি দূতাবাসগুলো রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে দেখাচ্ছে। নিয়মিত কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনা ও অবস্থান সম্পর্কে আরও বোঝাপড়া ও ধারণা পেতে বৈঠকগুলো করা হচ্ছে। বাংলাদেশের একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রতি যুক্তরাজ্যের অব্যাহত সমর্থন জানানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই বৈঠক।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ এই তৎপরতাকে স্বাভাবিক বললেও সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, প্রভাবশালী দেশগুলোর বিশেষ স্বার্থ থাকতে পারে এবং তারা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলকে প্রাধান্য দিচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









