সরকার কর্তৃক পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে এটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর অধ্যাদেশ আকারে জারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই কমিশন একটি সংবিধিবদ্ধ, স্বাধীন ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে, যার মূল লক্ষ্য পুলিশের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সংস্কার নিশ্চিত করা। তবে খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই কর্মরত পুলিশ সদস্যদের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে, যা স্বাধীন কমিশন গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
১. কর্মরতদের প্রতিনিধি না থাকা: মূল বিতর্ক
পুলিশ কমিশনের খসড়ায় যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা তৈরি হয়েছে, তা হলো কমিশনে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের কোনো প্রতিনিধি না রাখা।
কর্মরতদের বক্তব্য (ক্ষোভের কারণ)
- একতরফা সিদ্ধান্ত: কর্মরত পুলিশ সদস্যরা মনে করেন, যারা পুলিশ নিয়ে কাজ করবে, সেই কমিশনে যদি মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের প্রতিনিধি না থাকে, তবে বিষয়টি একতরফা হয়ে যাবে।
- গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ: এই খসড়ার আলোকে কমিশন গঠিত হলে, তার গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
- সুনির্দিষ্ট দাবি: বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ৯ সদস্যের প্রস্তাবিত কমিশনে কর্মরত প্রায় আড়াই লাখ নন-ক্যাডার পুলিশের পক্ষ থেকে কমপক্ষে একজন কর্মরত সদস্য এবং কর্মরত ক্যাডার কর্মকর্তাদেরও প্রতিনিধি হিসেবে রাখার দাবি জানানো হয়েছে। তারা মনে করেন, ক্যাডার ও নন-ক্যাডার সদস্যদের প্রতিনিধি থাকলে কমিশন অধিকতর কার্যকর হতো।
দায়িত্বশীলদের যুক্তি (নিরপেক্ষতার স্বার্থ)
- শতভাগ নিরপেক্ষতা: দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, কমিশনের শতভাগ নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতার স্বার্থেই কর্মরত সদস্যদের প্রতিনিধি রাখা হয়নি।
- নজরদারির কারণ: যেহেতু কর্মরত সকল পুলিশ সদস্য এই কমিশনের নজরদারির আওতায় থাকবেন, তাই নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কর্মরতদের বাদ দিয়ে অবসরপ্রাপ্তদের সদস্য রাখা হয়েছে। তারা অন্য দেশেও একই রেওয়াজ থাকার যুক্তি দেন।
২. পেশাগত দায়িত্ব পালনে সুরক্ষার দাবি
খসড়ায় পুলিশের কর্মকাণ্ডে দায়মুক্তির বিষয়টি রাখা হয়নি, যা কর্মরত সদস্যদের মধ্যে অন্যতম উদ্বেগের কারণ।
- মামলা থেকে সুরক্ষা: পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা দাবি করেছেন, পেনাল কোডের ধারাগুলোতে দায়িত্ব পালনে পুলিশের যথেষ্ট সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়নি, ফলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও পুলিশের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা হচ্ছে।
- প্রস্তাবিত সুরক্ষার বিধান: তাদের দাবি, স্বাধীন পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশে এমন বিধান রাখা জরুরি, যেন পুলিশের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো মামলা করা না যায়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি প্রথমে কমিশনে অভিযোগ দেবেন, কমিশন অনুসন্ধান করে প্রাথমিক প্রমাণ পেলে তবেই মামলাসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- আইজিপির অবস্থান: কর্মরতদের এই দাবি-দাওয়া আইজিপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তুলে ধরা হলেও, আইজিপি বাহারুল আলম জানিয়েছেন যে অধ্যাদেশ জারি হওয়ার আগে এগুলোর বিষয়ে কিছু করা সম্ভব নয়; অধ্যাদেশ আসার পর দাবিগুলো পর্যালোচনা করা হবে।
৩. পুলিশ কমিশনের গঠন ও কার্যাবলী
প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশনটি কী ধরনের কাজ করবে এবং কিভাবে গঠিত হবে তার একটি কাঠামো খসড়ায় তুলে ধরা হয়েছে।
কমিশনের কাঠামো:
কমিশনে মোট ৯ জন সদস্য থাকবেন, যার মধ্যে একজন চেয়ারম্যান, একজন সদস্য সচিব, পাঁচজন স্থায়ী সদস্য ও দুজন অস্থায়ী সদস্য।
- চেয়ারম্যান: সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। (মর্যাদা আপিল বিভাগের বিচারপতির সমান)।
- সদস্য সচিব: অবসরপ্রাপ্ত একজন আইজিপি।
- স্থায়ী সদস্য: অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা (সচিব পদমর্যাদার নিচে নন), অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার নিচে নন), খ্যাতনামা আইনজীবী/জেলা জজ পদমর্যাদার ব্যক্তি, ক্রিমিনোলজি ও ক্রিমিনাল জাস্টিস বিষয়ের অধ্যাপক, এবং খ্যাতনামা মানবাধিকার কর্মী।
- অস্থায়ী সদস্য: সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার একজন করে প্রতিনিধি।
- বাধ্যতামূলক সদস্য: কমিশনে কমপক্ষে একজন নারী সদস্য থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কমিশনের প্রধান কার্যাবলী:
- নজরদারি ও অভিযোগ তদন্ত: কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নাগরিকদের অভিযোগের ন্যায়সংগত তদন্ত ও সমাধান নিশ্চিত করা; পুলিশ সদস্যদের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ, বৈষম্য, পদোন্নতি সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তি করা।
- নীতিমালা ও সংস্কার: নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন ও মানদণ্ড নির্ধারণে সরকারকে দিকনির্দেশনা দেওয়া।
- আইজিপি নিয়োগ: আইজিপি পদে নিয়োগের জন্য সততা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা ইত্যাদির ভিত্তিতে তিনজন কর্মকর্তার একটি প্যানেল সরকারের কাছে সুপারিশ করা।
- গণআস্থা বৃদ্ধি: আধুনিক পুলিশিংয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া, গণশুনানি, পরামর্শ সভা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করে জনগণ-পুলিশ আস্থা পুনর্গঠন করা।
- প্রতিবেদন: প্রতি বছর একটি বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা, যা জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, কর্মরত পুলিশ সদস্যদের প্রতিনিধি না রাখার বিষয়টি কমিশনের কার্যকারিতা ও সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়াই যদি কোনো কমিশন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে, তবে পুলিশ সংস্কারের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে। তাই অধ্যাদেশ জারির পূর্বে কর্মরতদের দাবিকৃত পেশাগত সুরক্ষা এবং কমিশনে তাদের উপস্থিতির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









