রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের ট্র্যাক থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে এক পথচারী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনা মেট্রোরেলের নিরাপত্তা মান এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো এমন ঘটনা ঘটল।
মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার
নিহত যুবকের নাম আবুল কালাম, যিনি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ঈশ্বরকাঠি গ্রামের জলিল চোকদারের ছেলে। রোববার (তারিখ উল্লেখ নেই) দুপুর ১২টার দিকে ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের ৪৩৩ নম্বর পিলার থেকে একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে নিচে পড়ে। এর আঘাতে ঘটনাস্থলেই মারা যান পথচারী আবুল কালাম। আবুল কালাম স্ত্রী আইরিন আক্তার প্রিয়া এবং আব্দুল্লাহ ও সুরাইয়া নামের দুই শিশুসন্তান নিয়ে নারায়ণগঞ্জের পাঠানটুলী এলাকায় থাকতেন। তিনি মতিঝিলের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করতেন।স্বামীর মৃত্যুতে দিশাহারা স্ত্রী আইরিন আক্তার প্রিয়া এটিকে ‘মৃত্যু না, হত্যা’ বলে উল্লেখ করে মেট্রো কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বাচ্চা দুটি তাদের বাবাকে হারাল। সেটার ক্ষতিপূরণ কীভাবে হবে? আমার চাঁদগুলোর কী হবে? আব্দুল্লাহ ও সুরাইয়া আর বাবার সঙ্গে খেলতে পারবে না। আমার চাঁদগুলো কাকে বাবা বলে ডাকবে?”—এ প্রশ্নগুলো কর্তৃপক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
নিরাপত্তা মান ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ
মাত্র এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো মেট্রোরেল ট্র্যাকের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার ঘটনায় কর্তৃপক্ষের রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি, অবহেলা এবং নির্মাণত্রুটিসহ একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে যখন প্রথমবার বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে, তখন বিশেষজ্ঞরা একই ধরনের প্রশ্ন তুলে পরামর্শ দিয়েছিলেন। একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু সেই কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি এবং কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি।এবারের ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা অল্প সময়ের মধ্যে দুবার এমন ঘটনা ঘটায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে মেট্রোরেলের পুরো ট্র্যাকের নিরাপত্তা নিরীক্ষার (সেফটি অডিট) তাগিদ দিয়েছেন। বর্তমান ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তবে গতবারের অভিজ্ঞতার কারণে এই কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অযৌক্তিক নয়।
ব্যয় ও ‘উচ্চগুণগত মান’ নিয়ে প্রশ্ন
মেট্রোরেল নির্মাণে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাইকা (JICA) ‘উচ্চগুণগত মান’ রক্ষার যে দাবি করেছিল, এবং যে কারণে ব্যয় বেশি হয়েছিল—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাইকা বলেছিল, উচ্চগুণগত মানের কারণে মেট্রোর প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় বেশি হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত ব্যয় কম হবে। কিন্তু এত কম সময়ে বারবার বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার ঘটনা এই বক্তব্য নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে।
কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান
মাত্র এক বছরে উচ্চব্যয়সম্পন্ন মেট্রোরেলের দুবার বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য গভীর উদ্বেগের। কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে আবুল কালাম ও তার পরিবারের মতো এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার শিকার আর কোনো পরিবারকে হতে না হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









