বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যে প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে, তা ছিল তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশনা এবং বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালিত ৫ স্তরের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
১. 🎯 মনোনয়ন প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্য
- চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ: ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৩৭টি সম্ভাব্য প্রার্থীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। মাদারীপুর-১ আসনের মনোনয়ন স্থগিত রাখা হয়।
- নেতৃত্বের কেন্দ্রীভূতকরণ: দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করে সকল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যা প্রমাণ করে দলের নেতৃত্ব এখন সম্পূর্ণরূপে তার হাতে কেন্দ্রীভূত।
- কঠোর মানদণ্ড: মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে দলীয় নিয়ম, প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, নির্বাচনী এলাকায় তার গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে তার আত্মত্যাগমূলক অবদানের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে।
- তদবির ও প্রভাবমুক্ত: তারেক রহমানের কঠোর অবস্থানের কারণে অতীতে দলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মহলের তদবির বা পারিবারিক প্রভাবের কোনো অবকাশ রাখা হয়নি। এক পরিবারের একাধিক সদস্যকে মনোনয়ন না দেওয়ার বিষয়ে তিনি অটল ছিলেন।
২. 🔬 ৫ স্তরের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া
প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছ, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়:
- তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই: বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদকরা পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সামনে প্রতিবেদন পেশ করেন।
- মূল্যায়নের মানদণ্ড: প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক অবস্থান, ভোটারদের কাছে তার জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- পাঁচ ধরনের জরিপ: আন্তর্জাতিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে পাঁচটি ভিন্ন ধরনের জরিপ চালানো হয়। এতে প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে সম্ভাব্য প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা হয়।
- ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বৈঠক: তারেক রহমান সরাসরি মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগ্যতা, নির্বাচনী এলাকার পরিস্থিতি, জনপ্রিয়তা ও ত্যাগের মূল্যায়ন নিয়ে বৈঠক করেন।
- চূড়ান্ত অনুমোদন: ৩ নভেম্বর গুলশানে জাতীয় স্থায়ী কমিটির ম্যারাথন বৈঠকে তারেক রহমানের সভাপতিত্বে (ভার্চুয়াল) চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদিত হয়।
৩. 🧩 কৌশলগত ফাঁকা আসন ও জোট সমন্বয়
- ৬৩টি ফাঁকা আসন: কৌশলগত কারণে ২৩৭টি আসনে প্রার্থী ঘোষণার পর ৬৩টি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছে।
- ফাঁকা আসনের উদ্দেশ্য: স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মিত্র দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা এবং সামগ্রিক কৌশল অনুযায়ী পরবর্তীতে এসব আসনের প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। এটি ভবিষ্যৎ দর কষাকষির একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
- মিত্র দলের সঙ্গে আলোচনা: এনডিএম, জাতীয় পার্টি, এলডিপি, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, গণঅধিকার পরিষদ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে।
- এনসিপি’র দাবি: এনসিপি অন্তত ২০টি আসনে সমঝোতা চায় এবং বিএনপি ক্ষমতায় এলে মন্ত্রিসভায় তাদের তিনজনকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আগ্রহী। তবে বিএনপি তাদের জন্য ৮টি আসন ছাড়তে রাজি বলে জানা যায়।
- জোটের টানাপোড়েন: বিএনপি চাইছে, এনসিপি যেন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো নির্বাচনী সমঝোতায় না যায়।
৪. 🚀 তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া ও শৃঙ্খলা
- ইতিবাচক সাড়া: প্রার্থী তালিকায় নবীন ও প্রবীণ নেতাদের সমন্বয় থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।
- নেতাকর্মীদের উদ্দীপনা: তৃণমূল সংগঠন সুসংগঠিত, উজ্জীবিত ও সক্রিয় হয়েছে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে প্রচারণা শুরু করেছে।
- শৃঙ্খলা ও কঠোরতা: মাদারীপুর-১ আসনের প্রার্থী নেতিবাচক তথ্য পাওয়ায় মনোনয়ন স্থগিত করা হয়। এছাড়া চট্টগ্রামে বিক্ষোভ করা চারজনকে বহিষ্কার করা হয়। এটি তারেক রহমানের শৃঙ্খলার প্রতি কঠোর মনোভাবের প্রতিফলন।
- মনোনয়নবঞ্চিতদের প্রতি বার্তা: বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, যারা মনোনয়ন পাননি, তাদের যথাযথ দায়িত্ব ও সম্মান দেওয়া হবে।
৫. 🌟 রাজনৈতিক তাৎপর্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট:
- তারেক রহমানের একক নিয়ন্ত্রণ: এই প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, তারেক রহমান লন্ডন থেকে দলের সব কার্যক্রম সফলভাবে তত্ত্বাবধানে রেখে দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
- সংস্কারের ইঙ্গিত: এটি কেবল একটি নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে একটি বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত বহন করে।
- নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত: স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক মনোনয়ন এবং তৃণমূলের সঙ্গে সফল সমন্বয় বিএনপি’র জন্য এক নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
- ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব: রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পদক্ষেপগুলো সফল হলে তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী ও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবেন।
এই সতর্ক ও পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়াটি বিএনপির নেতৃত্বকে ভবিষ্যতের রাজনীতিকে মাথায় রেখে সাজানোর একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 










