দেশে ঘোষিত সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে বর্তমানে ব্যাপক সংশয় ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে সন্দেহ কাটছে না।
গণভোটের দাবিতে জামায়াত-এনসিপির কঠোর অবস্থান
নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের প্রধান কারণ হলো জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কঠোর অবস্থান। এই দুটি দল এখনো পর্যন্ত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠানের দাবিতে অনড় রয়েছে।
গত ৬ নভেম্বর রাজধানীর পল্টন মোড়ে এক সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জুলাই সনদ ও গণভোটকে ‘ঘি’ আখ্যা দিয়ে কঠোর হুমকি দিয়ে বলেন, “যদি সোজা আঙুলে ঘি না ওঠে, তাহলে আঙুল বাঁকা করবেন তারা।” এই ‘আঙুল বাঁকা করার’ হুমকির অর্থ স্পষ্ট—যদি সরকার নির্বাচনের আগে গণভোটের ব্যবস্থা না করে, তবে জামায়াত আন্দোলনে নামবে। তাদের সঙ্গে ছায়াসঙ্গী হিসেবে থাকবে এনসিপি। এর ফলে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যা নির্বাচনের আয়োজনকে গভীর অনিশ্চয়তায় ফেলবে।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভোটের হিসাব-নিকাশ করে বুঝতে পেরেছে যে, ঘোষিত সময়ে নির্বাচন হলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপির সরকার গঠন ঠেকানো তাদের পক্ষে অসম্ভব। তাই তাদের উদ্দেশ্য হলো, যেকোনো ইস্যুতে রাজপথে অস্থিরতা সৃষ্টি করে নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে ভন্ডুল করা এবং নির্বাচনকে পিছিয়ে দেওয়া। তারা মনে করছে, নির্বাচন পিছিয়ে গেলে এই সময়ের মধ্যে বিএনপির কর্মীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে দলটির ইমেজের যে ক্ষতি হয়েছে, তা জনসমর্থনে প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচন নিয়ে সরকারের কাজে ‘শুভংকরের ফাঁকি’
এদিকে নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাজকর্মে অনেকেই ‘শুভংকরের ফাঁকি’ লক্ষ্য করছেন।
- আরপিও সংশোধনী গেজেট: গত ৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করে, যা নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই গেজেটে বিএনপির প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও বলা হয়েছে, জোটবদ্ধ হলেও শরিক দলগুলোকে নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচনে অবতীর্ণ হতে হবে। এই সংশোধনী নিয়ে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তবে এনসিপি এই সংশোধনী গেজেটকে স্বাগত জানিয়েছে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদারও এই গেজেট নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, এতে কমিশনের অধিকাংশ সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়েছে।
- ড. আলী রীয়াজের প্রস্থান: প্রায় এক বছরের কার্যক্রম শেষে জুলাই সনদ গ্রহণ প্রশ্নে গণভোটের ফয়সালা হওয়ার আগেই জাতীয় ঐকমত্যে কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ চুপিসারে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন, যা জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশে ‘নতুন বন্দোবস্ত’ আবিষ্কারের কাজটি অসম্পূর্ণ রেখেই তার এই প্রস্থান সরকারের উদ্দেশ্যের ওপর আস্থা কমিয়েছে।
- রাজনৈতিক দলগুলোর কোর্টে ‘বল ঠেলে দেওয়া’: ড. আলী রীয়াজের প্রস্থান এবং জুলাই সনদ নিয়ে অচলাবস্থার পর সরকার গণভোট বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর অর্পণ করেছে। গত ৩ নভেম্বর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, “আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে গণভোটের ব্যাপারে ঐকমত্যে আসতে হবে। নাহলে সরকার নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেবে।” সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সংবাদপত্রগুলো ‘দলগুলোর কোর্টে সরকারের বল ঠেলে দেওয়া’ এবং ‘মোলায়েম হুমকি’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
আস্থার অভাব এবং সেনাবাহিনীর বার্তা
অনেকের মতে, জুলাই সনদ ও গণভোটের বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের একমত না হওয়ার জন্য সরকার এবং ঐকমত্য কমিশন বহুলাংশে দায়ী। তারা শুরু থেকেই জামায়াত ও এনসিপির প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়েছিল, যা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে।
এরই মধ্যে, গত ৫ নভেম্বর সেনাসদরে এক সংবাদ সম্মেলনে আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং লে. জেনারেল মো. মাইদুর রহমান বলেছেন, “নির্বাচন হলে দেশের পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হবে এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে।” সচেতন মহল সেনাবাহিনীর এই বক্তব্যকে দ্রুত নির্বাচনের প্রতি তাদের সমর্থন হিসেবে দেখছে।
কিন্তু এসব সত্ত্বেও, সাধারণ জনগণের বড় একটি অংশ মনে করে, ড. ইউনূস সরকার শেষ পর্যন্ত জামায়াত ও এনসিপিকে নাখোশ করে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। আর এখানেই নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংশয় এখনো জনমনে গভীরভাবে নিহিত আছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









