প্রায় তিন দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে, সংসদে এবং সুপ্রিম কোর্টে বহুল আলোচিত বিষয় হলো ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা। ১৯৯৬ সালে সংবিধানে যুক্ত হওয়া এবং ২০১১ সালে বাতিল হয়ে যাওয়া এই বিধানটি কীভাবে এবং কবে থেকে আবার সংবিধানে ফিরবে, তা নিয়ে বর্তমানে আলোচনা তুঙ্গে। একদিকে যেমন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক জারি করা জুলাই জাতীয় সনদে এর নতুন একটি কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের বিতর্কিত রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি চলছে। সবশেষে আপিল বিভাগেই এর ভাগ্য নির্ধারিত হবে।
আপিল শুনানি ও প্রত্যাশা
বর্তমানে আপিল বিভাগে যে আপিল শুনানি চলছে, সেখানে আবেদনকারী সব পক্ষের পাশাপাশি রাষ্ট্রপক্ষও সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনরুজ্জীবন চেয়েছে। পক্ষগুলো একমত যে, এই রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে বহাল হলেও তা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। বরং তারা চতুর্দশ সংসদ নির্বাচন থেকে এই ব্যবস্থা কার্যকর করার কথা বলছেন। অর্থাৎ, আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ নির্বাচন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনেই হবে।
অধিকাংশ পক্ষই বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বাতিলকারী রায়টি বাতিল চেয়েছেন, যার মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুনরুজ্জীবিত হবে। তবে ফরম্যাট বা কাঠামো নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া আর কোনো পক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দেয়নি।
বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ের রিভিউ আবেদন
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া বিতর্কিত রায়ের পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে গত বছর থেকে একাধিক আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
-
সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ ব্যক্তি (২৭ আগস্ট)
-
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (১৭ অক্টোবর)
-
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার (২৩ অক্টোবর)
রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষে গত ২৭ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত বিচারপতির বেঞ্চ আপিলের অনুমতি দেন। বর্তমানে সেই আপিলের ওপর শুনানি চলমান।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতে বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা হলো গণতন্ত্রকে সমুন্নত করার জন্য সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। তাই বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যে মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী অজুহাতে সংশোধনী বাতিল করেছিলেন, তা পুনর্বিবেচনা করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধানে ফিরিয়ে আনা উচিত। তিনি আদালতের কাছে বিচারপতি খায়রুল হকের রায়টি সম্পূর্ণ বাতিল করে আপিল মঞ্জুর করার আবেদন জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, আপিল মঞ্জুর হলে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে পুনরুজ্জীবিত হবে এবং এর কার্যকারিতা সবসময় পরবর্তী সময় থেকে শুরু হয়, অর্থাৎ এটি ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের পর গঠিত সংসদের পরের নির্বাচন থেকে কার্যকর হবে।
আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির মনে করেন, বাংলাদেশের নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা একটি গ্রহণযোগ্য ফর্মূলা। তিনি আপিল মঞ্জুর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বহাল করার পক্ষে মত দিয়েছেন, তবে এর সঙ্গে সুনির্দিষ্ট কোনো পর্যবেক্ষণ দেওয়া উচিত নয়। কারণ জুলাই সনদ ও বৃহত্তর সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যেখানে এই ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে এবং গণভোটের বিষয়টিও রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মঞ্জুর হলেও বর্তমান সংসদ না থাকায় এখন তা প্রয়োগ করা সম্ভব নয়, কারণ সংসদ ভেঙে না গেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সুযোগ নেই। এটি পরবর্তী সংসদ গঠিত হওয়ার পর প্রয়োগ হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায়টি থাকা উচিত নয়, কারণ এটি একটি রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য লেখা হয়েছিল। তিনি মনে করেন, এই ব্যবস্থা যদি এই সরকারের পরে যে সরকার আসবে, তখন থেকে কার্যকর করা হয়, তবে আইনের কোনো ব্যত্যয় হবে না। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কখন থেকে এবং কী ফরমেটে আসবে, তা আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দেবেন বলে তিনি মনে করেন।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভুঁইয়া বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসলেও তা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। বর্তমান সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সরকারের পতনের কারণে সৃষ্ট শূন্যতার ফলস্বরূপ গঠিত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিচারপতি খায়রুল হকের রায় বাতিল হলে আগের ত্রয়োদশ সংশোধনী আপনা আপনিভাবে পুনরুজ্জীবিত হবে (অষ্টম ও ষোড়শ সংশোধনীর মামলার নজির অনুযায়ী)। তিনি আদালতকে অনুরোধ করেন, রায়ে এই বিষয়টি স্পষ্ট করে দেওয়ার জন্য যে, এটি চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে সংবিধানে এসেছিল ও বাতিল হয়েছিল
সংবিধানে অন্তর্ভুক্তি
৯০-এর দশকে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি ওঠে। ১৯৯৬ সালে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের দাবির মুখে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী হিসেবে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই বছর ২৭ মার্চ এই পদ্ধতি প্রবর্তন হয় এবং এর অধীনে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা নিয়ে তেমন প্রশ্ন ওঠেনি।
বিতর্কিত বাতিল
আইনজীবী এম. সলিমউল্যাহসহ তিন আইনজীবীর করা রিটের ভিত্তিতে হাইকোর্ট ২০০৪ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে সংবিধানসম্মত ও বৈধ ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রিট আবেদনকারীরা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিল শুনানিতে আটজন অ্যামিকাস কিউরি’র (আদালতকে সহায়তাকারী) মতামত নেওয়া হয়, যাদের বেশিরভাগই ব্যবস্থাটি বহাল রাখার পক্ষে ছিলেন।
২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ (তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ চারজনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে) রায় দেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অগণতান্ত্রিক এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই এটি বাতিলযোগ্য। রায়ে প্রথমে দশম ও একাদশ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হলেও, ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে সেই পর্যবেক্ষণটি বাদ দেওয়া হয়। তখন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে রায় পরিবর্তনের অভিযোগ ওঠে।
এই রায়ের পর সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক প্রথা বিলোপ করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুরাতন ও নতুন কাঠামো
ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী কাঠামো (১৯৯৬)
সংবিধানের ৫৮(খ), ৫৮(গ), ৫৮(ঘ) ও ৫৮(ঙ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হতো প্রধান উপদেষ্টা এবং অনধিক ১০ জন উপদেষ্টার সমন্বয়ে।
-
প্রধান উপদেষ্টা: সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি (সহমত না হলে, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের মধ্যে বয়সে জ্যেষ্ঠতম জন, তিনিও সম্মত না হলে আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতম জন)।
-
মেয়াদ: অনধিক ৯০ দিন।
-
যোগ্যতা: উপদেষ্টা হতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে, রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া যাবে না এবং আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ার লিখিত সম্মতি দিতে হতো। বয়সসীমা ছিল ৭২ বছর।
জুলাই সনদে প্রস্তাবিত কাঠামো (২০২৫)
অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া জুলাই জাতীয় সনদ এর ১৬ ধারায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার নতুন একটি কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে এবং ৫৮(খ), ৫৮(গ), ৫৮(ঘ) ও ৫৮(ঙ) অনুচ্ছেদ হিসেবে নতুন করে যুক্ত করার প্রস্তাব করেছে।
-
প্রধান উপদেষ্টা বাছাই কমিটি: সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিন আগে এই কমিটি গঠিত হবে।
-
সদস্য সংখ্যা: পাঁচজন (প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের), ও সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি)।
-
-
সময়সীমা: সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে এবং অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে, ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ চূড়ান্ত করতে হবে।
-
উপদেষ্টাদের বয়সসীমা: ৭৫ বছরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
-
পরবর্তী বিকল্প: এই পদ্ধতিতে প্রধান উপদেষ্টা বেছে নেওয়া সম্ভব না হলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণ করতে হবে, তবে রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বেছে নেওয়া যাবে না।
-
গণভোটের শর্ত: সনদে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









