০৩:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থান মামলায় রায় ঘোষণা: শেখ হাসিনা ও কামালের মৃত্যুদণ্ড, রাজসাক্ষী মামুনের কারাদণ্ড

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ কর্তৃক এক ঐতিহাসিক রায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিন আসামির বিরুদ্ধেই আনীত অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

সোমবার (১৭ নভেম্বর) চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

আসামিদের সাজা ও রাজসাক্ষীর ভূমিকা

রায়ে আসামিদের শাস্তির ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়:

  • শেখ হাসিনা: তাঁর বিরুদ্ধে আনা মোট পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে দুটি অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, অন্য একটি অভিযোগে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।

  • আসাদুজ্জামান খান কামাল: সাবেক এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

  • চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন: মামলার অপর আসামি এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, যিনি আসামি থেকে দায় স্বীকার করে ‘রাজসাক্ষী’ (অ্যাপ্রুভার) হয়েছিলেন, তাঁকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। রাজসাক্ষী হওয়ার কারণে আদালত তাঁর সাজার পরিমাণ হ্রাস করেছেন।

বিচার প্রক্রিয়ার সময়ক্রম ও সংশ্লিষ্টরা

এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য প্রথমে গত ২৩ অক্টোবর শুনানি সম্পন্ন হয় এবং তারিখ নির্ধারণের জন্য ১৩ নভেম্বর ধার্য করা হয়। পরবর্তীতে, ১৩ নভেম্বর চূড়ান্ত রায়ের জন্য ১৭ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করা হয়।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। অন্যদিকে, পলাতক দুই আসামি (শেখ হাসিনা ও কামাল)-এর পক্ষে আইনি লড়াইয়ে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। উল্লেখ্য, ট্রাইব্যুনাল গত ১০ জুলাই এ মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন এবং একইসঙ্গে সাবেক আইজিপি মামুনের রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ

আসামিদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল, যা নিম্নরূপ:

১. উসকানিমূলক বক্তব্য ও ব্যাপক হত্যা: প্রথম অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এর জের ধরে আসাদুজ্জামান খান, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ তৎকালীন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা ও সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ করে। এই হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে দেড় হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয় এবং প্রায় ২৫ হাজার জন আহত হন।

২. মারণাস্ত্র প্রয়োগ ও সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি: দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ দেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি এই নির্দেশ কার্যকর করেন। এ সংক্রান্ত কথোপকথনের পৃথক অডিও রেকর্ড থেকে জানা যায়, ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল এবং ১৮ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ সব বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায় এবং এর আলোকেই মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। এই দায়ে আসামিদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (সর্বোচ্চ দায়) আওতায় অভিযোগ আনা হয়।

৩. আবু সাঈদকে হত্যা: রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়।

৪. ছয়জনকে গুলি করে হত্যা (চানখাঁরপুল): রাজধানীর চানখাঁরপুলে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়।

৫. ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা (আশুলিয়া): আশুলিয়ায় নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায়ও শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়।

জনপ্রিয়

জুলাই গণঅভ্যুত্থান মামলায় রায় ঘোষণা: শেখ হাসিনা ও কামালের মৃত্যুদণ্ড, রাজসাক্ষী মামুনের কারাদণ্ড

প্রকাশিত : ০৩:৩৬:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ নভেম্বর ২০২৫

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ কর্তৃক এক ঐতিহাসিক রায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিন আসামির বিরুদ্ধেই আনীত অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

সোমবার (১৭ নভেম্বর) চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

আসামিদের সাজা ও রাজসাক্ষীর ভূমিকা

রায়ে আসামিদের শাস্তির ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়:

  • শেখ হাসিনা: তাঁর বিরুদ্ধে আনা মোট পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে দুটি অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, অন্য একটি অভিযোগে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।

  • আসাদুজ্জামান খান কামাল: সাবেক এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

  • চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন: মামলার অপর আসামি এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, যিনি আসামি থেকে দায় স্বীকার করে ‘রাজসাক্ষী’ (অ্যাপ্রুভার) হয়েছিলেন, তাঁকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। রাজসাক্ষী হওয়ার কারণে আদালত তাঁর সাজার পরিমাণ হ্রাস করেছেন।

বিচার প্রক্রিয়ার সময়ক্রম ও সংশ্লিষ্টরা

এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণার জন্য প্রথমে গত ২৩ অক্টোবর শুনানি সম্পন্ন হয় এবং তারিখ নির্ধারণের জন্য ১৩ নভেম্বর ধার্য করা হয়। পরবর্তীতে, ১৩ নভেম্বর চূড়ান্ত রায়ের জন্য ১৭ নভেম্বর দিন নির্ধারণ করা হয়।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। অন্যদিকে, পলাতক দুই আসামি (শেখ হাসিনা ও কামাল)-এর পক্ষে আইনি লড়াইয়ে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। উল্লেখ্য, ট্রাইব্যুনাল গত ১০ জুলাই এ মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন এবং একইসঙ্গে সাবেক আইজিপি মামুনের রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ

আসামিদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল, যা নিম্নরূপ:

১. উসকানিমূলক বক্তব্য ও ব্যাপক হত্যা: প্রথম অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এর জের ধরে আসাদুজ্জামান খান, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ তৎকালীন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা ও সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ করে। এই হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে দেড় হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয় এবং প্রায় ২৫ হাজার জন আহত হন।

২. মারণাস্ত্র প্রয়োগ ও সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি: দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ দেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি এই নির্দেশ কার্যকর করেন। এ সংক্রান্ত কথোপকথনের পৃথক অডিও রেকর্ড থেকে জানা যায়, ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল এবং ১৮ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ সব বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায় এবং এর আলোকেই মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। এই দায়ে আসামিদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (সর্বোচ্চ দায়) আওতায় অভিযোগ আনা হয়।

৩. আবু সাঈদকে হত্যা: রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়।

৪. ছয়জনকে গুলি করে হত্যা (চানখাঁরপুল): রাজধানীর চানখাঁরপুলে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়।

৫. ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা (আশুলিয়া): আশুলিয়ায় নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায়ও শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়।