০৩:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
নিগার সুলতানা জ্যোতির জবাব

স্বৈরাচারী’ তকমা ও ড্রেসিংরুমের দ্বন্দ্ব নিয়ে মুখ খুললেন বাংলাদেশ অধিনায়ক জ্যোতি

গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতিকে ঘিরে যে বিতর্ক এবং অভিযোগের ঝড় বইছিল—জুনিয়রদের শারীরিক শাসন থেকে শুরু করে সিনিয়রদের ক্যারিয়ারে হস্তক্ষেপ—সেই সবকিছুর জবাব দিয়েছেন তিনি। পায়ের নিচের হাড়ে (শিনবোনে) চোটের কারণে বর্তমানে বিকেএসপিতে পুনর্বাসনে থাকা অবস্থায় ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘ক্রিকবাজ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

চোট ও পুনর্বাসন আপডেট

জ্যোতি জানান, তার পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ভালোভাবে চলছে। তিন-চার মাস ধরে শিনবোনে চোট থাকলেও বিশ্বকাপের গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি খেলা চালিয়ে গিয়েছিলেন। মুম্বাইয়ে চিকিৎসকেরা তাকে চার থেকে ছয় সপ্তাহের বিশ্রাম এবং বিশেষায়িত ফিটনেস কাজের পরামর্শ দেন। তিনি স্বীকার করেন যে চোটের কারণে বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

“এই বিশ্বকাপটা আমার অনুকূলে ছিল না। কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও পারফর্ম করতে পারিনি। আমি স্বাভাবিক ধারায় থাকলে আমরা হয়তো আরও দুই ম্যাচ জিততে পারতাম।”

‘স্বৈরাচারী’ তকমা ও নেতৃত্ব সংকট

ড্রেসিংরুমে তার কথিত ‘স্বৈরশাসন’ এবং সিনিয়রদের সঙ্গে টানাপোড়েনের অভিযোগ তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন:

  • ‘স্বৈরাচারী’ অভিযোগ: জ্যোতি সরাসরি এই তকমা অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোনোভাবেই স্বৈরাচারী নই… কে এসব বলছে এবং কেন বলছে—এখন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।”

  • সিন্ডিকেট অভিযোগ: তিনি সিনিয়র ক্রিকেটার জাহানারা আলম ও রুমানা আহমেদকে দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য ‘সিন্ডিকেট’ গড়ার অভিযোগও নাকচ করেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন: “আমি কে? আমি কি নির্বাচক?”

  • নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না থাকা: জ্যোতির দাবি, ২০২১ সালে অধিনায়ক হওয়ার পরেও ২০২৩ সালের অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে পর্যন্ত তাকে নির্বাচক প্যানেলের বৈঠকে রাখা হতো না। তিনি অন্যান্য খেলোয়াড়দের মতোই ম্যাচের দিন একাদশ জানতে পারতেন এবং স্কোয়াড নির্বাচনেও তাকে কিছু জিজ্ঞেস করা হতো না।

  • নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা সংকট: তিনি সিনিয়রদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার মূল কারণ হিসেবে ‘গ্রহণযোগ্যতার সংকটকে’ দায়ী করেন। তার মতে, তাকে অধিনায়ক করার পরই সমস্যা শুরু। তিনি শুনেছেন যে, “একটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগেই চার–পাঁচজন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তারা একজন জুনিয়রের অধীনে খেলবেন না।”

  • সালমা খাতুনের প্রশ্ন: নিউজিল্যান্ডে এক ম্যাচে সিনিয়র সালমা খাতুন তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “তুই আমাদের বসিয়ে রাখলি?” জ্যোতি যখন কিছুই জানেন না জানান, তখন সালমা বলেছিলেন, “তাহলে তুই শুধু টস করতেই ক্যাপ্টেন?” জ্যোতি উত্তর দেন, “কিছুটা তাই। তারা মনে করতেন আমি ছোট, অপরিপক্ব—তাই আমাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে রাখা হতো না।”

জুনিয়রদের মারধর বিতর্ক

জুনিয়রদের গালিগালাজ বা মারধর করার অভিযোগকে জ্যোতি ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার দাবি, “একজনই এসব বলেছে, বহুজন না।”

  • মুর্শিদাকে চড় মারা: ২০২২ সালের জাতীয় ক্রিকেট লিগে মুর্শিদাকে চড় মারার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তখন তারা ভিন্ন ভিন্ন দলে খেলতেন এবং তাদের মধ্যে খুব কমই কথা হতো।

  • মারুফাকে ধমক: শ্রীলঙ্কায় ফাস্ট বোলার মারুফাকে ধমক দেওয়ার ঘটনাকে ‘বিকৃতভাবে ছড়ানো’ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মারুফা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ক্যাচ ফেলায় এবং হাতে আঘাত পাওয়ায় তাকে মাঠের বাইরে যেতে বলেছিলেন। পরে মারুফা জ্যোতিকে জানান যে, অধিনায়কের কথায় নয়—নিজের ফিল্ডিং ব্যর্থতার হতাশা থেকেই তিনি কেঁদেছিলেন।

ভারত সিরিজের আগে আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ

আসন্ন ভারত সিরিজের আগে দলের মধ্যে সম্পর্ক ও আস্থা পুনর্গঠন করা যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তা স্বীকার করেছেন জ্যোতি। তিনি বলেন, “প্রথমত আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত সিনিয়র–জুনিয়রদের বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে…” তবে তিনি এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন:

“ভালোবাসা, সম্মান বা সমর্থন জোর করে পাওয়া যায় না। এগুলো অর্জন করতে হয়। আমি সেটাই করার চেষ্টা করছি।”

জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে আয়ারল্যান্ডের বিশাল সংগ্রহ, টেক্টরের বিধ্বংসী ইনিংস

নিগার সুলতানা জ্যোতির জবাব

স্বৈরাচারী’ তকমা ও ড্রেসিংরুমের দ্বন্দ্ব নিয়ে মুখ খুললেন বাংলাদেশ অধিনায়ক জ্যোতি

প্রকাশিত : ০২:৩৭:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫

গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতিকে ঘিরে যে বিতর্ক এবং অভিযোগের ঝড় বইছিল—জুনিয়রদের শারীরিক শাসন থেকে শুরু করে সিনিয়রদের ক্যারিয়ারে হস্তক্ষেপ—সেই সবকিছুর জবাব দিয়েছেন তিনি। পায়ের নিচের হাড়ে (শিনবোনে) চোটের কারণে বর্তমানে বিকেএসপিতে পুনর্বাসনে থাকা অবস্থায় ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘ক্রিকবাজ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।

চোট ও পুনর্বাসন আপডেট

জ্যোতি জানান, তার পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ভালোভাবে চলছে। তিন-চার মাস ধরে শিনবোনে চোট থাকলেও বিশ্বকাপের গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি খেলা চালিয়ে গিয়েছিলেন। মুম্বাইয়ে চিকিৎসকেরা তাকে চার থেকে ছয় সপ্তাহের বিশ্রাম এবং বিশেষায়িত ফিটনেস কাজের পরামর্শ দেন। তিনি স্বীকার করেন যে চোটের কারণে বিশ্বকাপে তার পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

“এই বিশ্বকাপটা আমার অনুকূলে ছিল না। কঠোর পরিশ্রম সত্ত্বেও পারফর্ম করতে পারিনি। আমি স্বাভাবিক ধারায় থাকলে আমরা হয়তো আরও দুই ম্যাচ জিততে পারতাম।”

‘স্বৈরাচারী’ তকমা ও নেতৃত্ব সংকট

ড্রেসিংরুমে তার কথিত ‘স্বৈরশাসন’ এবং সিনিয়রদের সঙ্গে টানাপোড়েনের অভিযোগ তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন:

  • ‘স্বৈরাচারী’ অভিযোগ: জ্যোতি সরাসরি এই তকমা অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোনোভাবেই স্বৈরাচারী নই… কে এসব বলছে এবং কেন বলছে—এখন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।”

  • সিন্ডিকেট অভিযোগ: তিনি সিনিয়র ক্রিকেটার জাহানারা আলম ও রুমানা আহমেদকে দল থেকে বাদ দেওয়ার জন্য ‘সিন্ডিকেট’ গড়ার অভিযোগও নাকচ করেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন: “আমি কে? আমি কি নির্বাচক?”

  • নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না থাকা: জ্যোতির দাবি, ২০২১ সালে অধিনায়ক হওয়ার পরেও ২০২৩ সালের অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে পর্যন্ত তাকে নির্বাচক প্যানেলের বৈঠকে রাখা হতো না। তিনি অন্যান্য খেলোয়াড়দের মতোই ম্যাচের দিন একাদশ জানতে পারতেন এবং স্কোয়াড নির্বাচনেও তাকে কিছু জিজ্ঞেস করা হতো না।

  • নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা সংকট: তিনি সিনিয়রদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার মূল কারণ হিসেবে ‘গ্রহণযোগ্যতার সংকটকে’ দায়ী করেন। তার মতে, তাকে অধিনায়ক করার পরই সমস্যা শুরু। তিনি শুনেছেন যে, “একটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগেই চার–পাঁচজন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তারা একজন জুনিয়রের অধীনে খেলবেন না।”

  • সালমা খাতুনের প্রশ্ন: নিউজিল্যান্ডে এক ম্যাচে সিনিয়র সালমা খাতুন তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “তুই আমাদের বসিয়ে রাখলি?” জ্যোতি যখন কিছুই জানেন না জানান, তখন সালমা বলেছিলেন, “তাহলে তুই শুধু টস করতেই ক্যাপ্টেন?” জ্যোতি উত্তর দেন, “কিছুটা তাই। তারা মনে করতেন আমি ছোট, অপরিপক্ব—তাই আমাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে রাখা হতো না।”

জুনিয়রদের মারধর বিতর্ক

জুনিয়রদের গালিগালাজ বা মারধর করার অভিযোগকে জ্যোতি ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার দাবি, “একজনই এসব বলেছে, বহুজন না।”

  • মুর্শিদাকে চড় মারা: ২০২২ সালের জাতীয় ক্রিকেট লিগে মুর্শিদাকে চড় মারার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তখন তারা ভিন্ন ভিন্ন দলে খেলতেন এবং তাদের মধ্যে খুব কমই কথা হতো।

  • মারুফাকে ধমক: শ্রীলঙ্কায় ফাস্ট বোলার মারুফাকে ধমক দেওয়ার ঘটনাকে ‘বিকৃতভাবে ছড়ানো’ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মারুফা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ক্যাচ ফেলায় এবং হাতে আঘাত পাওয়ায় তাকে মাঠের বাইরে যেতে বলেছিলেন। পরে মারুফা জ্যোতিকে জানান যে, অধিনায়কের কথায় নয়—নিজের ফিল্ডিং ব্যর্থতার হতাশা থেকেই তিনি কেঁদেছিলেন।

ভারত সিরিজের আগে আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ

আসন্ন ভারত সিরিজের আগে দলের মধ্যে সম্পর্ক ও আস্থা পুনর্গঠন করা যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তা স্বীকার করেছেন জ্যোতি। তিনি বলেন, “প্রথমত আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয়ত সিনিয়র–জুনিয়রদের বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে…” তবে তিনি এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন:

“ভালোবাসা, সম্মান বা সমর্থন জোর করে পাওয়া যায় না। এগুলো অর্জন করতে হয়। আমি সেটাই করার চেষ্টা করছি।”