চারবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেও সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির প্রতি লোভ এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তার দুই সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকেও পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আল মামুন প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার এই রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত শেখ হাসিনার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি সরকারি পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেসহ পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনকে বেআইনিভাবে সম্পত্তি বরাদ্দ দিয়েছেন, যা তার “স্থায়ী দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা” ও “সরকারি সম্পত্তির প্রতি লোভী দৃষ্টি”র পরিচয় বহন করে।
রায়ের প্রধান দিকগুলো:
-
সাজার বিবরণ: তিনটি পৃথক মামলায় শেখ হাসিনাকে সাত বছর করে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি করে মামলায় তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে পাঁচ বছর করে সাজা প্রদান করা হয়েছে। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার সন্তানদের বিরুদ্ধে এটিই প্রথম কোনো মামলার রায়, যাতে তারা দণ্ডিত হলেন।
-
মোট দণ্ডিত: এই রায়ে মোট ২১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। দণ্ডিতদের মধ্যে সাবেক গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরিফ আহমেদ, সাবেক দুই সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার ও কাজী ওয়াছি উদ্দিন এবং রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিয়াসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রয়েছেন।
-
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: আদালত শেখ হাসিনা এবং তার দুই সন্তানের নামে বরাদ্দকৃত মোট ৩০ কাঠা (প্রত্যেকে ১০ কাঠা করে) সম্পত্তির বরাদ্দ বাতিল করেছেন। রাজউককে এই বিরোধপূর্ণ প্লটগুলোর দখল গ্রহণ করে যোগ্য আবেদনকারীদের মধ্যে পুনরায় বরাদ্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও তীব্র নিন্দা:
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। আদালতের প্রধান পর্যবেক্ষণগুলো হলো:
১. ক্ষমতার অপব্যবহার ও লোভ: আদালত বলেন, দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী থাকার সুবাদে সেই কর্তৃত্ব ব্যবহার করে শেখ হাসিনা রাজউকের ৬০ কাঠা সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে ১০ কাঠা নিজের জন্য এবং বাকি ৫০ কাঠা তার ছেলে, মেয়ে, বোন (শেখ রেহানা) এবং বোনের সন্তানদের (রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক) মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন। এটি তার “অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার ব্যবহার এবং সরকারি সম্পত্তির প্রতি লোভী দৃষ্টি” প্রমাণ করে। ২. রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত মনে করা: আদালত মন্তব্য করেন, শেখ হাসিনা সরকারি সম্পত্তিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো মনে করতেন এবং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে তা পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়েছেন। ৩. আইনের লঙ্ঘন ও আস্থার সংকট: এই বরাদ্দ প্রক্রিয়াকে আইনসঙ্গত প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ উল্লেখ করে আদালত বলেন, তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে আইনের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। এ ধরনের কাজ জনগণের সঙ্গে আস্থার সংকট তৈরি করে এবং সুশাসনের নীতিকে ক্ষুণ্ন করে। ৪. দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং জনগণের আস্থা ফেরাতে এই ধরনের আচরণের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন বলে আদালত অভিমত ব্যক্ত করেন।
মামলার প্রেক্ষাপট:
পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরে প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির অভিযোগে গত জানুয়ারিতে দুদক পৃথক ছয়টি মামলা দায়ের করে। সরকারপ্রধানের পদে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্যে নিজেদের নামে প্লট বরাদ্দের অভিযোগ আনা হয়। গত ৩১ জুলাই আদালত এই মামলাগুলোতে অভিযোগ গঠন করেন। আসামিরা বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









