২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দেওয়া একটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে মৃত্যুদণ্ড চাইবে প্রসিকিউশন। এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম।
রায়ের প্রাপ্তি ও আপিলের সিদ্ধান্ত:
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানান, গত ১৭ নভেম্বর দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি তাঁরা পেয়েছেন। রায় পর্যালোচনার পর প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, যে অভিযোগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেই অভিযোগের শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করার জন্য আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে। অন্য একটি অভিযোগে এই দুজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রায়ের বিস্তারিত ও ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ:
গত ১৭ নভেম্বর বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সব পক্ষের আইনজীবীরা হাতে পেয়েছেন।
মৃত্যুদণ্ড ও কারাদণ্ডের পাশাপাশি অন্যান্য নির্দেশ:
-
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
-
শহীদদের পরিবার এবং আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের তীব্র পর্যবেক্ষণ: ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেছেন, “হাত, পা, নাক, চোখ, মাথার খুলি হারানো যেসব সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের বাস্তব অবস্থা দেখলে যেকোনো মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা ধরে রাখা কঠিন। ফলে এই অপরাধের সাথে জড়িতদের যেকোনো মূল্যে বিচারের আওয়াতায় আনা উচিত। এক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ব্যাহত হতে দেয়ার সুযোগ নেই।”
অভিযোগ ১ (আমৃত্যু কারাদণ্ড): প্রথম অভিযোগে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনাল-১ বলেছেন, সংঘটিত অপরাধে প্ররোচনা ও উস্কানি দেওয়া, আন্দোলনকারীদের হত্যার নির্দেশ এবং সংঘটিত অপরাধ প্রতিরোধে নিষ্ক্রিয়তা ও অপরাধ সংঘটনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়ী। এসব অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ ২ (মৃত্যুদণ্ড): দ্বিতীয় অভিযোগের অপরাধ বর্ণনা করে ট্রাইব্যুনাল-১ বলেন, এই অভিযোগে শেখ হাসিনাকে দু’টি অপরাধের জন্য দায়ী করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি অপরাধ হচ্ছে জুলাই গণআন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ। এই নির্দেশনা দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এ ৩(২)(ছ) (জ) ও ৪(১) (২) (৩) ধারার অপরাধ সংঘটন করেছেন। দ্বিতীয় অপরাধটি হচ্ছে, শেখ হাসিনার এই নির্দেশ অনুসরণ করে গত বছর ৫ আগস্ট চানখাঁরপুল এলাকায় ছয়জনকে গুলি করে হত্যা ও একই দিনে সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়া। এই অভিযোগে সাজা ঘোষণা করতে গিয়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, আদালতের সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এই সমস্ত অপরাধের জন্য তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
সহ-আসামিদের সাজা:
-
একই অপরাধে সহ-আসামি আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
-
সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, তিনি রাজসাক্ষী হয়ে সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিষয়ে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যা বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালতকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করেছে। তাই তাকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত নমনীয়তা প্রদর্শন করেছে।
আইনজীবীদের উপস্থিতি: প্রসিকিউশন পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এস এইচ তামিম শুনানি করেন। এছাড়াও প্রসিকিউটর বি এম সুলতান মাহমুদ, শাইখ মাহদি, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন। পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন। রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান।
সাক্ষ্যগ্রহণ ও অভিযোগ গঠন: এই ঐতিহাসিক মামলায় গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বাবাসহ স্বজনহারা পরিবারের অনেকে এবং স্টার উইটনেস হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমানসহ সর্বোমোট ৫৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে গত ১০ জুলাই অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। একপর্যায়ে দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ও ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনে আওয়ামী লীগ সরকার, তাদের দলীয় ক্যাডার ও সরকারের অনুগত প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ে। বর্তমানে দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সে সব অভিযোগের বিচার চলছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 








