হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করেছে, ভোরবেলার শিশিরে ভিজে উঠছে উঠোন, আর সকালের বাতাসে কনকনে সতেজতা শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে এসেছে। শীতের এই রোমান্টিক আবহাওয়া বয়স্কদের জন্য আরামদায়ক হলেও, এটি শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে তাদের নরম ত্বক দ্রুত শুষ্ক হয়ে যায়, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট বেড়ে ওঠে এবং তাপমাত্রার তারতম্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাই শীতের শুরুতেই শিশুদের জন্য বাড়তি যত্ন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
🧴 ত্বকের যত্ন: আর্দ্রতা ধরে রাখা আবশ্যক
শীতকালে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় শিশুদের সংবেদনশীল ত্বক দ্রুত ফেটে যায়, গাল লাল হয়ে ব্যথা করে এবং হাত-পায়ের ত্বক রুক্ষ হয়ে পড়ে। শিশুর ত্বক প্রাকৃতিকভাবে সংবেদনশীল হওয়ায় এই সময়ে তাদের ত্বকের স্বাভাবিক তেল দ্রুত কমে যায়।
-
গোসলের নিয়ম: শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, গোসলের পানিতে অতিরিক্ত গরম পানি ব্যবহার করলে ত্বক আরও শুকিয়ে যেতে পারে। তাই হালকা গরম পানি ব্যবহার করা উচিত। সপ্তাহে ২-৩ বার গোসল করানো যথেষ্ট।
-
সাবান ব্যবহার: গোসলের সময় সাবান কম ব্যবহার করতে হবে, কারণ সাবান ত্বকের প্রাকৃতিক তেল শোষণ করে নেয়।
-
ময়েশ্চারাইজ: গোসলের পরপরই শিশুদের জন্য মানানসই ময়েশ্চারাইজার, লোশন, ক্রিম বা বেবি অয়েল ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। এটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। গোসল শেষে শিশুর শরীর পুরোপুরি শুকিয়ে নিতে হবে।
🧥 পোশাক ও অ্যালার্জির সতর্কতা
শীতে শিশুদের সঠিক পোশাক নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিশু কাপড়ের অ্যালার্জি বা ধুলার সংস্পর্শে এসে র্যাশে আক্রান্ত হয়।
-
পোশাকের স্তর: শিশুদের পোশাকে সিনথেটিক কাপড়ের ব্যবহার কমাতে হবে। বরং প্রথমে প্রাকৃতিক সুতি কাপড়ের পোশাক পরিয়ে তার ওপর শীতের পোশাক ব্যবহার করা ভালো। এতে ত্বক শ্বাস নিতে পারে এবং অ্যালার্জির ঝুঁকি কমে।
-
মাথা ও গলা সুরক্ষা: কনকনে ঠান্ডা এড়াতে শিশুকে মাথা ও গলা ঢাকা রাখার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
🤧 সর্দি-কাশি ও অসুস্থতা প্রতিরোধ
শীতে ঠান্ডা-গরমের দ্রুত পরিবর্তনে শিশুদের সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকি বাড়ে।
-
তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণ: বাইরে থেকে এসে হঠাৎ গরম ঘরে প্রবেশ করা বা সকালে খুব ঠান্ডা পরিবেশে বের হওয়া এড়াতে হবে। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, ঘরের ভেতরের উষ্ণতা একটি সহনীয় মাত্রায় বজায় রাখতে হবে।
-
ভিড় এড়িয়ে চলা: ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অন্যান্য শীতকালীন রোগের সংক্রমণ এড়াতে শিশুকে ভিড় বা জনসমাগমপূর্ণ স্থান থেকে দূরে রাখা উচিত।
-
জলীয় খাবার: শিশুকে ঘন ঘন হালকা গরম পানি পান করানোর অভ্যাস তৈরি করতে হবে, যা শরীরকে উষ্ণ রাখে এবং গলাকে সতেজ রাখে।
-
সুরক্ষার গুরুত্ব: শীতকালীন ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকি বেশি থাকায় নাক-কান-গলা সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
🍎 খাদ্য তালিকা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা
শীতকালে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তাই পুষ্টিকর এবং উষ্ণতা প্রদানকারী খাবার দিয়ে খাদ্য তালিকা সমৃদ্ধ করা জরুরি।
-
ভিটামিন সি: শিশুর বয়স অনুযায়ী ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল (যেমন: কমলা, মাল্টা, পেয়ারা) বেশি করে দিতে হবে।
-
উষ্ণ খাবার: শাকসবজি, ডিম, দুধ, চিকেন স্যুপ বা নিরামিষ স্যুপ খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি। এসব খাবার শিশুকে ভেতর থেকে উষ্ণ রাখে ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
-
পুষ্টির ফল: যে শিশু নিয়মিত মৌসুমি ফল ও পুষ্টিকর খাবার খায়, শীতে তার অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে আসে।
🚨 কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
শিশুর অসুস্থতার কিছু লক্ষণ দেখলে দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
-
শিশুর শ্বাস নিতে কষ্ট হলে।
-
ঠোঁট বা নখ নীলাভ হয়ে গেলে।
-
২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জ্বর থাকলে।
-
কান ব্যথা হলে।
-
ত্বকে ফুসকুড়ি বা অস্বাভাবিক র্যাশ দেখা দিলে।
শীতের সময়টায় সঠিক যত্ন এবং সতর্কতার মাধ্যমে আপনার শিশুকে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
নিজস্ব প্রতিবেদক 















