দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকট, চিকিৎসকের প্রতি আস্থাহীনতা, রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে না শোনা, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ, বাড়তি পরীক্ষা-নিরীক্ষার চাপ—এসব কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। ফলে প্রতিবছর চিকিৎসা বাবদ বিশাল অঙ্কের টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে চলে যাচ্ছে।
বিদেশে বছরে চিকিৎসা ব্যয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা বিদেশে চিকিৎসার জন্য বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
সম্প্রতি এক সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর বলেন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশিদের প্রাথমিক গন্তব্য ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশিরা বিদেশে চিকিৎসার জন্য বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশিদের বিদেশে চিকিৎসা বাবদ ব্যয়ের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিকভাবে হয়। এতে দেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা বৈদেশিক লেনদেনের ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি হয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির জন্য চিকিৎসক ও নার্সদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তিনি।
স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দের দেড়গুণ ব্যয় বিদেশে
২০২৫–২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে যে পরিমাণ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার দেড়গুণেরও বেশি টাকা বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে বিদেশে চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যাংকের মাধ্যমে যে অর্থ যায়, তা প্রকৃত চিত্রের তুলনায় নগণ্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
বিদেশে অস্ত্রোপচার করাতে চিকিৎসা ভিসার প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ ও চিকিৎসার যাবতীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। ফলে অনেকেই ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে গিয়ে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) অধীনে ৭৫০ শয্যাবিশিষ্ট দেশের প্রথম সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ যে পরিমাণ টাকা বাংলাদেশের মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে খরচ করছেন, তা দিয়ে বছরে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের মতো অন্তত ৪০টি হাসপাতাল নির্মাণ করা সম্ভব।
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার কারণ
সম্প্রতি বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরেছেন এমন কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সার্বিকভাবে বাংলাদেশে চিকিৎসার খরচ বেশি, রোগ নির্ণয়ে ত্রুটি, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসকদের রোগীর প্রতি আন্তরিকতার অভাব ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান—এসব কারণেই দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে তারা বিদেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগীদের মধ্যে সর্বাধিক ক্যানসার রোগী, যা মোট বিদেশগামী রোগীর ২১ শতাংশ। হৃদরোগের কারণে ১৮ শতাংশ বিদেশে যান। এ ছাড়া প্রজনন জটিলতা, অর্থোপেডিক, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি, লিভার, কিডনি, চোখ, কান ও স্নায়ুবিষয়ক চিকিৎসার জন্যও বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যান।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান হারে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বিদেশে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। যদিও অনেক চিকিৎসা দেশেই পাওয়া যায়, তবু দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় সন্তুষ্টির অভাবে বিদেশমুখী প্রবণতা বাড়ছে।
বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার কারণ ও সমাধান বিষয়ে জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, সারা দেশের মানুষের কাছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হবে। যদি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সবার কাছে পৌঁছায়, তাহলে অনেক রোগের উৎপত্তিই হবে না। এরপর মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা পিরামিড আকারে গঠন করতে হবে—নিচে প্রাথমিক, মাঝখানে মাধ্যমিক এবং সবার ওপরে বিশেষায়িত হাসপাতাল থাকবে। জটিল হার্ট অপারেশন বিদেশে হলে খুব আপত্তি নেই, কিন্তু চোখের ছানি বা গলব্লাডার অপারেশনের জন্য মানুষ কেন বিদেশে যাবে? কারণ আমাদের দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সর্বজনীন নয়, মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাথমিকের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণ জটিল রোগ তৈরি হয়, সে অনুপাতে হাসপাতালের বেড নেই। যা আছে, সেখানেও অব্যবস্থাপনা। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আমলাতন্ত্রের মতো ‘মাথাভারী’ হয়ে গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগের চিকিৎসা না করে সেটিকে জটিল করার প্রবণতা রয়েছে। ফলে গরিব মানুষ যায় ঢাকা মেডিক্যালে, আর ধনীরা যায় ফাইভ-স্টার মানের বেসরকারি হাসপাতালে।
তিনি আরও বলেন, জেলা হাসপাতালগুলোতে অপারেশন করাতে গেলে বলা হয়—আমাদের এটা নেই, সেটা নেই, ঢাকায় চলে যান। এখন জেলা শহর থেকে ঢাকার বদলে মাদ্রাজে গেলে সময় ও খরচও কখনও কম পড়ে। ভারতে বা থাইল্যান্ডে মাথাপিছু কত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, আর আমাদের দেশে কত আছে—তুলনা করলেই বোঝা যায় পার্থক্য।
তার মতে, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হাসপাতাল গড়ে তোলার কারণে না আমরা রোগীর সংখ্যা কমাতে পারছি, না জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে, না জনগণের চিকিৎসার চাহিদা পূরণ করতে পারছি। ঢাকায় যত বড় হাসপাতালই বানানো হোক, বিদেশে রোগী যাওয়া ঠেকানো যাবে না। বিদেশে রোগী যাওয়া কমাতে হলে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। চিকিৎসকদের রোগীর প্রতি আরও আন্তরিক ও মনোযোগী হতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন ও চিকিৎসা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা কমবে, দেশের মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 













