০৮:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

শিক্ষা প্রশাসনের ‘বদলির চাঁদরাত’ ও দুর্নীতির মহোৎসব

বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসন যেন এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কবজায়। গত ১১ ডিসেম্বর এক রাতের ব্যবধানে শিক্ষা ক্যাডারের ৪৭৫ জন কর্মকর্তার বদলি ও পদায়ন সেই তিক্ত সত্যকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার ঠিক আগ মুহূর্তে সংঘটিত এই বিশাল রদবদলকে সংশ্লিষ্টরা ‘বদলির চাঁদরাত’ বলে অভিহিত করছেন। অভিযোগ উঠেছে, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এই এক রাতের বদলি বাণিজ্যে লেনদেন হয়েছে কোটি কোটি টাকা।

নজিরবিহীন পরিসংখ্যান ও পদোন্নতির জোয়ার

নির্বাচনী তপশিলের পর বদলি প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে—এমন অজুহাতে ১১ ডিসেম্বর ১৬টি পৃথক আদেশে ৪৭৫ জনকে বদলি করা হয়। এর মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন কলেজে ৩৮০ জনের বদলি আদেশ কার্যকর হয়। শুধু বদলি নয়, একই দিনে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে ২,৭০৬ জন কর্মকর্তাকে। সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে ৯৯৫ জন এবং সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে ১,৭১১ জন পদোন্নতি পান। এছাড়া ৯৪ জনকে বিভিন্ন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ পদে পদায়ন করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বিগত সরকারের সমর্থক ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নামও রয়েছে।

সিন্ডিকেটের ‘বলয়’ ও কলকাঠি নাড়ানি

অভিযোগের আঙুল উঠেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের পিএস রকিবুল হাসানের দিকে। ইকোনমিক ক্যাডার থেকে আসা এই কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী ‘বলয়’ তৈরি হয়েছে, যারা বদলি-পদায়নের ফাইল আটকে রেখে সুযোগ বুঝে অনুমোদন করিয়ে নেয়। এই সিন্ডিকেটে সরকারি কলেজ শাখার উপসচিব তানিয়া ফেরদৌসসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে, যারা গত দেড় মাস ফাইল আটকে রাখার পর হঠাৎ করেই এক রাতে সব ফাইল ছাড় করান।

‘ঘুষের রাজ্য’ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)

শিক্ষা প্রশাসনের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়েছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে। এখানে কর্মকর্তাদের ঘুষ নেওয়ার রেট নির্ধারিত হয় শিক্ষকদের এক মাসের বেতনের সমান। এই দপ্তরের সহকারী পরিদর্শক ফজিলাতুন্নেসা মিতুর মতো বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বদলি আদেশ রহস্যজনকভাবে বাতিল করা হয়েছে। মিতুর বিরুদ্ধে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় যাতায়াত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ার অভিযোগ থাকলেও তিনি বহাল তবিয়তে আছেন।

অন্যদিকে, নূশরাত হাছনীনের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তিনি পরিদর্শনের নামে শিক্ষকদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করেন। পটুয়াখালী ও যশোরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর ‘ঘুষ বাণিজ্যের’ তথ্য উঠে এসেছে। ‘সায়লেন্ট লেডি’ বা ‘ঘুষের রানি’ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তার খুঁটির জোর নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রাজনৈতিক পুনর্বাসন ও বিতর্কিতদের দাপট

আওয়ামী লীগ শাসনামলে সুবিধাপ্রাপ্ত এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারতকারী কর্মকর্তাদেরও বড় বড় পদে পদায়ন করা হয়েছে। ডিআইএ-তে এ. টি. এম আল ফাত্তাহ ও এফ এম শাহাবুদ্দীন রুমনের পদায়ন নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে ফাত্তাহ যোগদান করেননি। এছাড়া ফিরোজ আলমের মতো কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) উপপরিচালক হাবিবুর রহমানের মতো ‘দীপু মনির ক্যাশিয়ার’ খ্যাত কর্মকর্তাদের লোভনীয় পদে থাকা প্রমাণ করে যে, প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান কেবল লোকদেখানো।

সচিববিহীন সময়ের সুযোগ ও ‘শতকোটির’ এনামুল

সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয়েছে শিক্ষা সচিববিহীন এক মাসে। এই সময়ে সচিবের পিএস, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবদের নিয়ে গঠিত চার সিন্ডিকেট দেদার বদলি করিয়েছে। এই সুযোগে ড. এনামুল হকের মতো সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। ডিআইএ-তে দীর্ঘ ১৩ বছর কর্মরত এনামুল ‘শতকোটির এনামুল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তারা পুনরায় সংগঠিত হচ্ছেন বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে।

            এই বিপুল অনিয়ম নিয়ে শিক্ষা সচিব রেহানা পারভীনের কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও কলেজ শাখার যুগ্ম সচিব খোদেজা খাতুন একে ‘রুটিন কাজ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—যদি এটি রুটিন কাজই হয়, তবে কেন এক রাতেই এত বিপুল সংখ্যক বদলি? কেন বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজদের তালিকা বারবার সামনে আসার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পুরস্কৃত করা হচ্ছে?

           শিক্ষা ক্যাডারের এই ‘চাঁদরাতের’ বদলি বাণিজ্য প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও প্রশাসনের গভীরে গেঁথে থাকা দুর্নীতির শেকড় উপড়ানো সম্ভব হয়নি। একটি মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষা প্রশাসনের এই সিন্ডিকেট ভাঙা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

শিক্ষা প্রশাসনের ‘বদলির চাঁদরাত’ ও দুর্নীতির মহোৎসব

প্রকাশিত : ০৬:১৯:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের শিক্ষা প্রশাসন যেন এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কবজায়। গত ১১ ডিসেম্বর এক রাতের ব্যবধানে শিক্ষা ক্যাডারের ৪৭৫ জন কর্মকর্তার বদলি ও পদায়ন সেই তিক্ত সত্যকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার ঠিক আগ মুহূর্তে সংঘটিত এই বিশাল রদবদলকে সংশ্লিষ্টরা ‘বদলির চাঁদরাত’ বলে অভিহিত করছেন। অভিযোগ উঠেছে, অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এই এক রাতের বদলি বাণিজ্যে লেনদেন হয়েছে কোটি কোটি টাকা।

নজিরবিহীন পরিসংখ্যান ও পদোন্নতির জোয়ার

নির্বাচনী তপশিলের পর বদলি প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে—এমন অজুহাতে ১১ ডিসেম্বর ১৬টি পৃথক আদেশে ৪৭৫ জনকে বদলি করা হয়। এর মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন কলেজে ৩৮০ জনের বদলি আদেশ কার্যকর হয়। শুধু বদলি নয়, একই দিনে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে ২,৭০৬ জন কর্মকর্তাকে। সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে ৯৯৫ জন এবং সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে ১,৭১১ জন পদোন্নতি পান। এছাড়া ৯৪ জনকে বিভিন্ন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ পদে পদায়ন করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বিগত সরকারের সমর্থক ও বিতর্কিত কর্মকর্তাদের নামও রয়েছে।

সিন্ডিকেটের ‘বলয়’ ও কলকাঠি নাড়ানি

অভিযোগের আঙুল উঠেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের পিএস রকিবুল হাসানের দিকে। ইকোনমিক ক্যাডার থেকে আসা এই কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী ‘বলয়’ তৈরি হয়েছে, যারা বদলি-পদায়নের ফাইল আটকে রেখে সুযোগ বুঝে অনুমোদন করিয়ে নেয়। এই সিন্ডিকেটে সরকারি কলেজ শাখার উপসচিব তানিয়া ফেরদৌসসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে, যারা গত দেড় মাস ফাইল আটকে রাখার পর হঠাৎ করেই এক রাতে সব ফাইল ছাড় করান।

‘ঘুষের রাজ্য’ পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)

শিক্ষা প্রশাসনের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়েছে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে। এখানে কর্মকর্তাদের ঘুষ নেওয়ার রেট নির্ধারিত হয় শিক্ষকদের এক মাসের বেতনের সমান। এই দপ্তরের সহকারী পরিদর্শক ফজিলাতুন্নেসা মিতুর মতো বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বদলি আদেশ রহস্যজনকভাবে বাতিল করা হয়েছে। মিতুর বিরুদ্ধে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় যাতায়াত এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ার অভিযোগ থাকলেও তিনি বহাল তবিয়তে আছেন।

অন্যদিকে, নূশরাত হাছনীনের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তিনি পরিদর্শনের নামে শিক্ষকদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করেন। পটুয়াখালী ও যশোরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁর ‘ঘুষ বাণিজ্যের’ তথ্য উঠে এসেছে। ‘সায়লেন্ট লেডি’ বা ‘ঘুষের রানি’ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তার খুঁটির জোর নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রাজনৈতিক পুনর্বাসন ও বিতর্কিতদের দাপট

আওয়ামী লীগ শাসনামলে সুবিধাপ্রাপ্ত এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারতকারী কর্মকর্তাদেরও বড় বড় পদে পদায়ন করা হয়েছে। ডিআইএ-তে এ. টি. এম আল ফাত্তাহ ও এফ এম শাহাবুদ্দীন রুমনের পদায়ন নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে ফাত্তাহ যোগদান করেননি। এছাড়া ফিরোজ আলমের মতো কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) উপপরিচালক হাবিবুর রহমানের মতো ‘দীপু মনির ক্যাশিয়ার’ খ্যাত কর্মকর্তাদের লোভনীয় পদে থাকা প্রমাণ করে যে, প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান কেবল লোকদেখানো।

সচিববিহীন সময়ের সুযোগ ও ‘শতকোটির’ এনামুল

সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয়েছে শিক্ষা সচিববিহীন এক মাসে। এই সময়ে সচিবের পিএস, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবদের নিয়ে গঠিত চার সিন্ডিকেট দেদার বদলি করিয়েছে। এই সুযোগে ড. এনামুল হকের মতো সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। ডিআইএ-তে দীর্ঘ ১৩ বছর কর্মরত এনামুল ‘শতকোটির এনামুল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তারা পুনরায় সংগঠিত হচ্ছেন বলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে।

            এই বিপুল অনিয়ম নিয়ে শিক্ষা সচিব রেহানা পারভীনের কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও কলেজ শাখার যুগ্ম সচিব খোদেজা খাতুন একে ‘রুটিন কাজ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—যদি এটি রুটিন কাজই হয়, তবে কেন এক রাতেই এত বিপুল সংখ্যক বদলি? কেন বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজদের তালিকা বারবার সামনে আসার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পুরস্কৃত করা হচ্ছে?

           শিক্ষা ক্যাডারের এই ‘চাঁদরাতের’ বদলি বাণিজ্য প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও প্রশাসনের গভীরে গেঁথে থাকা দুর্নীতির শেকড় উপড়ানো সম্ভব হয়নি। একটি মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে শিক্ষা প্রশাসনের এই সিন্ডিকেট ভাঙা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।