০৭:৩৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা: কেন্দ্রবিন্দুতে রাকসু জিএস ও প্রশাসনিক সংকট

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক রদবদল শুরু হয়েছে, তার উত্তাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি)। গত কয়েক মাস ধরে পোষ্য কোটা, আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের পদত্যাগ এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থা নিয়ে এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই বিদ্যাপীঠ।

রাজশাহী: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক মাস ধরে চলা ধারাবাহিক উত্তেজনা এখন চরমে পৌঁছেছে। একদিকে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের অপসারণের দাবি, অন্যদিকে ছাত্র প্রতিনিধিদের হাতে শিক্ষকদের হেনস্তার অভিযোগ—সব মিলিয়ে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার।

১. পোষ্য কোটা ও শিক্ষক হেনস্তা

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ১০টি শর্তে পোষ্য কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। এর প্রতিবাদে ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীরা উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনের গাড়ি ২০ মিনিট আটকে রাখেন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, উপ-উপাচার্যের গলা চেপে ধরে সিঁড়িতে ফেলে দেওয়া এবং উপ-রেজিস্ট্রার রবিউল ইসলামের দাড়ি ধরে টান দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন সালাহউদ্দিন আম্মার। এই ঘটনার তদন্ত কমিটি হলেও তিন মাসেও প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২. ‘অপারেশন জিরো টলারেন্স ফর ফ্যাসিজম’ ও তালা সংস্কৃতি

আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের পদত্যাগের দাবিতে আম্মার ‘অপারেশন জিরো টলারেন্স ফর ফ্যাসিজম’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। গত ২১ ডিসেম্বর ৬ জন ডিনের পদত্যাগের দাবিতে তিনি প্রশাসন ভবন ও ডিনস কমপ্লেক্সে তালা ঝুলিয়ে দেন। দিনভর চরম উত্তেজনার পর সন্ধ্যায় প্রশাসন ওই ৬ ডিনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া বিভিন্ন সমাবেশে আম্মার শিক্ষকদের উদ্দেশে ‘জুতা খুলে মুখে মারা’ বা ‘বেঁধে রাখা’র মতো চরম হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।

৩. শিক্ষকদের নিরাপত্তা শঙ্কা ও ছাত্রদলের অবস্থান

শিক্ষকদের হেনস্তার প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামসহ বিএনপিপন্থি তিনটি সংগঠন উপাচার্যের কাছে নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে। তারা আম্মারের আচরণকে ‘অছাত্রসুলভ’ ও ‘ভীতিকর’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে সিএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী জাহিদ ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

বিস্ময়করভাবে, শাখা ছাত্রদলও আম্মারের এই কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার অপচেষ্টা ক্যাম্পাসে অরাজকতা সৃষ্টির একটি কুচক্রী ষড়যন্ত্র।

৪. সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্বেগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সন্দিহান। অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী নোমান ইমতিয়াজের মতে, শিক্ষা ও গবেষণার চেয়ে সবাই এখন জাতীয় রাজনীতি নিয়ে বেশি ব্যস্ত। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি কাম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমানও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেছেন, বর্তমানে ক্যাম্পাসের অবস্থা ভালো বলা যাচ্ছে না।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে সালাহউদ্দিন আম্মার জানিয়েছেন, তিনি যা করছেন তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই করছেন। তিনি বলেন, “আমি জানি শেষ পর্যন্ত হয়তো সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে পারব না, কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে যাব।” তিনি আরও দাবি করেন, ক্যাম্পাসে কোনো নিরপেক্ষ শিক্ষক নেই এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ দলীয় স্বার্থে ব্যস্ত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অস্থিরতা কেবল শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি ঘটাচ্ছে না, বরং উচ্চশিক্ষার সার্বিক পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ‘মব জাস্টিস’ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দাবি আদায়ের এই সংস্কৃতি ভবিষ্যতে একটি ভয়াবহ নজির হয়ে থাকতে পারে।

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা: কেন্দ্রবিন্দুতে রাকসু জিএস ও প্রশাসনিক সংকট

প্রকাশিত : ০৯:৫৫:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক রদবদল শুরু হয়েছে, তার উত্তাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি)। গত কয়েক মাস ধরে পোষ্য কোটা, আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের পদত্যাগ এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থা নিয়ে এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই বিদ্যাপীঠ।

রাজশাহী: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক মাস ধরে চলা ধারাবাহিক উত্তেজনা এখন চরমে পৌঁছেছে। একদিকে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের অপসারণের দাবি, অন্যদিকে ছাত্র প্রতিনিধিদের হাতে শিক্ষকদের হেনস্তার অভিযোগ—সব মিলিয়ে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার।

১. পোষ্য কোটা ও শিক্ষক হেনস্তা

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ১০টি শর্তে পোষ্য কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। এর প্রতিবাদে ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীরা উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনের গাড়ি ২০ মিনিট আটকে রাখেন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, উপ-উপাচার্যের গলা চেপে ধরে সিঁড়িতে ফেলে দেওয়া এবং উপ-রেজিস্ট্রার রবিউল ইসলামের দাড়ি ধরে টান দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, এই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছেন সালাহউদ্দিন আম্মার। এই ঘটনার তদন্ত কমিটি হলেও তিন মাসেও প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২. ‘অপারেশন জিরো টলারেন্স ফর ফ্যাসিজম’ ও তালা সংস্কৃতি

আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের পদত্যাগের দাবিতে আম্মার ‘অপারেশন জিরো টলারেন্স ফর ফ্যাসিজম’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। গত ২১ ডিসেম্বর ৬ জন ডিনের পদত্যাগের দাবিতে তিনি প্রশাসন ভবন ও ডিনস কমপ্লেক্সে তালা ঝুলিয়ে দেন। দিনভর চরম উত্তেজনার পর সন্ধ্যায় প্রশাসন ওই ৬ ডিনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া বিভিন্ন সমাবেশে আম্মার শিক্ষকদের উদ্দেশে ‘জুতা খুলে মুখে মারা’ বা ‘বেঁধে রাখা’র মতো চরম হুমকিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন।

৩. শিক্ষকদের নিরাপত্তা শঙ্কা ও ছাত্রদলের অবস্থান

শিক্ষকদের হেনস্তার প্রতিবাদে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামসহ বিএনপিপন্থি তিনটি সংগঠন উপাচার্যের কাছে নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে। তারা আম্মারের আচরণকে ‘অছাত্রসুলভ’ ও ‘ভীতিকর’ বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে সিএসই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী জাহিদ ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

বিস্ময়করভাবে, শাখা ছাত্রদলও আম্মারের এই কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার অপচেষ্টা ক্যাম্পাসে অরাজকতা সৃষ্টির একটি কুচক্রী ষড়যন্ত্র।

৪. সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্বেগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সন্দিহান। অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী নোমান ইমতিয়াজের মতে, শিক্ষা ও গবেষণার চেয়ে সবাই এখন জাতীয় রাজনীতি নিয়ে বেশি ব্যস্ত। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি কাম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমানও পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেছেন, বর্তমানে ক্যাম্পাসের অবস্থা ভালো বলা যাচ্ছে না।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে সালাহউদ্দিন আম্মার জানিয়েছেন, তিনি যা করছেন তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই করছেন। তিনি বলেন, “আমি জানি শেষ পর্যন্ত হয়তো সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে পারব না, কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে যাব।” তিনি আরও দাবি করেন, ক্যাম্পাসে কোনো নিরপেক্ষ শিক্ষক নেই এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ দলীয় স্বার্থে ব্যস্ত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অস্থিরতা কেবল শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি ঘটাচ্ছে না, বরং উচ্চশিক্ষার সার্বিক পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ‘মব জাস্টিস’ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দাবি আদায়ের এই সংস্কৃতি ভবিষ্যতে একটি ভয়াবহ নজির হয়ে থাকতে পারে।