০৭:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

বেগম খালেদা জিয়া: দেশই যার একমাত্র ঠিকানা

  • মাহবুব মুনীর
  • প্রকাশিত : ০১:১৮:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • 29

বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি এবং কোটি মানুষের আবেগ ও সাহসের বাতিঘর। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে একটি বিশাল ও মহিমান্বিত বটবৃক্ষের পতন ঘটল।

“দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। দেশই হলো আমার ঠিকানা।”—লন্ডনের মাটিতে দাঁড়িয়ে ২০১৫ সালে উচ্চারণ করা এই একটি বাক্যই যথেষ্ট বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমের গভীরতা পরিমাপ করার জন্য। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিনবারের নির্বাচিত সরকারপ্রধান এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) সেই প্রিয় স্বদেশের মাটিতেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন, মিশে গেলেন তাঁর চিরচেনা ঠিকানায়—বাংলার মাটি আর মানুষের হৃদয়ে।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ছিল সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত। ১৯৮১ সালে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দিশেহারা বিএনপির হাল ধরতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। ঘরোয়া জীবনের এক সাধারণ নারী থেকে তিনি হয়ে উঠলেন এক আপসহীন জননেত্রী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি এক অভাবনীয় বিজয় ছিনিয়ে আনেন, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, কেবল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী পরিচয়ে নয়, বরং নিজের মেধা এবং আপসহীন নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশকে সঠিক পথে পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন।

বেগম জিয়ার অন্যতম বড় অবদান ছিল নারী শিক্ষার প্রসারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতিকে শিক্ষিত করতে হলে আগে নারী জাতিকে শিক্ষিত করতে হবে। ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে তাঁর সরকার নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি কার্যক্রম চালু করে, যা গ্রামীণ জনপদে এক নীরব বিপ্লব ঘটায়। তাঁর এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলে ইউনেস্কো ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশকে ‘অসামান্য অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের এই মডেলকে বিশ্বের সামনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিল।

গণতন্ত্রের প্রশ্নে খালেদা জিয়া ছিলেন অকুতোভয়। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনে তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, যা আজও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল ভিত্তি। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাস করতেন। ১৯৯৬ সালে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নেও তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। কখনো কারাবন্দি, কখনো গৃহবন্দি। তাঁর ওপর চাপানো হয়েছে অসংখ্য মামলা। এমনকি ২০১৮ সালে কারাবরণের পর তাঁর অসুস্থতা নিয়ে সরকারের অমানবিক আচরণও তাঁকে তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াকু মনোভাব এবং ‘আপসহীন’ তকমাটি সময়ের পরীক্ষায় বারবার উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সফলতার পর তিনি যখন মুক্তি পান, তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল প্রতিহিংসা নয়, বরং সহনশীলতা ও ঐক্যের বার্তা।

বেগম জিয়ার কাছে রাজনীতি ছিল ত্যাগের জায়গা। পরিবারের মায়া ত্যাগ করে, বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বারবার স্বদেশের বুকেই ফিরে এসেছেন। ২০১৫ সালে লন্ডনের সেই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “দেশের এই মুহূর্তে আমাকে দেশে যাওয়াটাও প্রয়োজন।” তাঁর এই দায়িত্ববোধই তাঁকে জনগণের নেত্রী বানিয়েছে।আজ তিনি নেই, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মযজ্ঞ এবং অগণিত নেতাকর্মীর প্রতি তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের প্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, শহীদ জিয়ার উত্তরসূরিরা কখনো হার মানেন না। বেগম খালেদা জিয়া মানেই বিএনপি, আর বিএনপি মানেই বাংলাদেশের এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন।

বিদায় হে দেশনেত্রী, বিদায় হে জননী। আপনি আপনার প্রিয় ঠিকানায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন, কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন আর নারী জাগরণের ইতিহাসে আপনি থেকে যাবেন এক ধ্রুবতারা হয়ে।

জনপ্রিয়

বেগম খালেদা জিয়া: দেশই যার একমাত্র ঠিকানা

প্রকাশিত : ০১:১৮:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি এবং কোটি মানুষের আবেগ ও সাহসের বাতিঘর। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে একটি বিশাল ও মহিমান্বিত বটবৃক্ষের পতন ঘটল।

“দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। দেশই হলো আমার ঠিকানা।”—লন্ডনের মাটিতে দাঁড়িয়ে ২০১৫ সালে উচ্চারণ করা এই একটি বাক্যই যথেষ্ট বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমের গভীরতা পরিমাপ করার জন্য। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিনবারের নির্বাচিত সরকারপ্রধান এবং উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আজ মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) সেই প্রিয় স্বদেশের মাটিতেই তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন, মিশে গেলেন তাঁর চিরচেনা ঠিকানায়—বাংলার মাটি আর মানুষের হৃদয়ে।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ছিল সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত। ১৯৮১ সালে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর দিশেহারা বিএনপির হাল ধরতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। ঘরোয়া জীবনের এক সাধারণ নারী থেকে তিনি হয়ে উঠলেন এক আপসহীন জননেত্রী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি এক অভাবনীয় বিজয় ছিনিয়ে আনেন, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, কেবল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী পরিচয়ে নয়, বরং নিজের মেধা এবং আপসহীন নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশকে সঠিক পথে পরিচালনার ক্ষমতা রাখেন।

বেগম জিয়ার অন্যতম বড় অবদান ছিল নারী শিক্ষার প্রসারে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতিকে শিক্ষিত করতে হলে আগে নারী জাতিকে শিক্ষিত করতে হবে। ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে তাঁর সরকার নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি কার্যক্রম চালু করে, যা গ্রামীণ জনপদে এক নীরব বিপ্লব ঘটায়। তাঁর এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলে ইউনেস্কো ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশকে ‘অসামান্য অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের এই মডেলকে বিশ্বের সামনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছিল।

গণতন্ত্রের প্রশ্নে খালেদা জিয়া ছিলেন অকুতোভয়। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনে তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, যা আজও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল ভিত্তি। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাস করতেন। ১৯৯৬ সালে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা বাস্তবায়নেও তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। কখনো কারাবন্দি, কখনো গৃহবন্দি। তাঁর ওপর চাপানো হয়েছে অসংখ্য মামলা। এমনকি ২০১৮ সালে কারাবরণের পর তাঁর অসুস্থতা নিয়ে সরকারের অমানবিক আচরণও তাঁকে তাঁর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াকু মনোভাব এবং ‘আপসহীন’ তকমাটি সময়ের পরীক্ষায় বারবার উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সফলতার পর তিনি যখন মুক্তি পান, তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল প্রতিহিংসা নয়, বরং সহনশীলতা ও ঐক্যের বার্তা।

বেগম জিয়ার কাছে রাজনীতি ছিল ত্যাগের জায়গা। পরিবারের মায়া ত্যাগ করে, বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি বারবার স্বদেশের বুকেই ফিরে এসেছেন। ২০১৫ সালে লন্ডনের সেই অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “দেশের এই মুহূর্তে আমাকে দেশে যাওয়াটাও প্রয়োজন।” তাঁর এই দায়িত্ববোধই তাঁকে জনগণের নেত্রী বানিয়েছে।আজ তিনি নেই, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মযজ্ঞ এবং অগণিত নেতাকর্মীর প্রতি তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের প্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, শহীদ জিয়ার উত্তরসূরিরা কখনো হার মানেন না। বেগম খালেদা জিয়া মানেই বিএনপি, আর বিএনপি মানেই বাংলাদেশের এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন।

বিদায় হে দেশনেত্রী, বিদায় হে জননী। আপনি আপনার প্রিয় ঠিকানায় চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন, কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন আর নারী জাগরণের ইতিহাসে আপনি থেকে যাবেন এক ধ্রুবতারা হয়ে।