০৭:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬

বেগম খালেদা জিয়া: আপসহীন এক নেতৃত্বের মহাকাব্য

  • মাহবুব মুনীর
  • প্রকাশিত : ০১:২৩:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • 34

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অটল ও মহিমান্বিত নাম বেগম খালেদা জিয়া। দেশীয় জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে উজ্জীবিত এক বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি কেবল একজন নেত্রী নন, বরং ‘আপসহীনতার’ এক জীবন্ত প্রতীক।

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন এক ধ্রুবতারা। তাঁর রাজনীতিতে আসা ছিল আকস্মিক, কিন্তু তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর যখন বিএনপি এক চরম অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত, ঠিক তখনই দলের হাল ধরতে এগিয়ে আসেন তিনি। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দিলেও তাঁর অসামান্য নেতৃত্বগুণ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে দ্রুতই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আমৃত্যু তিনি এই দলটিকে আগলে রেখেছেন এক মমতাময়ী অভিভাবকের মতো।

বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় হলো নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে তিনি যে আপসহীন অবস্থান নিয়েছিলেন, তা ছিল নজিরবিহীন। কোনো প্রকার রাজনৈতিক সমঝোতা বা ক্ষমতার প্রলোভন তাঁকে রাজপথ থেকে সরাতে পারেনি। ১৯৮৭ সাল থেকে শুরু হওয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফা আন্দোলনে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব ১৯৯১ সালে দেশে গণতন্ত্রের নতুন সূর্যোদয় ঘটায়। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

বেগম জিয়া কেবল মাঠের নেত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নারী শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত; তিনি দুইবার দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’-এর চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর একটি অনন্য ও বিরল রেকর্ড রয়েছে—তিনি পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং প্রতিটি আসনেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নেতার এমন অবিস্মরণীয় রেকর্ড আর নেই।

বেগম জিয়ার পুরো জীবনটাই ছিল ত্যাগের এক বিশাল ক্যানভাস। ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বারবার গ্রেপ্তার হন। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত সরকারের সময় যখন তাঁকে দেশত্যাগের জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়, তখন তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, “বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা।” এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে তাঁর দেশপ্রেমের গভীরতা।

পরবর্তী ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে চরমভাবে। ৩৭টি মামলা এবং টানা সাত বছরের কারাবন্দি জীবন তাঁর শারীরিক অবস্থাকে নাজুক করে দিলেও তাঁর আদর্শকে দমাতে পারেনি। ২০১০ সালে তাঁকে তাঁর দীর্ঘ ২৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাসের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, যা ছিল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। তবুও তিনি মাথা নত করেননি।

বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী হিসেবে নন, বরং বাংলাদেশের মানুষের কাছে হার না মানা দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে বেঁচে থাকবেন। নির্যাতন, কারাবাস ও শারীরিক অসুস্থতা—কোনো কিছুই তাঁর গণতান্ত্রিক চেতনাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। দেশ, মাটি ও মানুষের প্রশ্নে তাঁর এই আপসহীন মানসিকতা তাঁকে ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে প্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—বাংলাদেশের রাজনীতির এক ‘আপসহীন মহীয়সী’ হিসেবে।

জনপ্রিয়

বেগম খালেদা জিয়া: আপসহীন এক নেতৃত্বের মহাকাব্য

প্রকাশিত : ০১:২৩:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অটল ও মহিমান্বিত নাম বেগম খালেদা জিয়া। দেশীয় জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে উজ্জীবিত এক বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে তিনি কেবল একজন নেত্রী নন, বরং ‘আপসহীনতার’ এক জীবন্ত প্রতীক।

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন এক ধ্রুবতারা। তাঁর রাজনীতিতে আসা ছিল আকস্মিক, কিন্তু তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর যখন বিএনপি এক চরম অস্তিত্ব সংকটে নিপতিত, ঠিক তখনই দলের হাল ধরতে এগিয়ে আসেন তিনি। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দিলেও তাঁর অসামান্য নেতৃত্বগুণ ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁকে দ্রুতই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আমৃত্যু তিনি এই দলটিকে আগলে রেখেছেন এক মমতাময়ী অভিভাবকের মতো।

বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় হলো নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে তিনি যে আপসহীন অবস্থান নিয়েছিলেন, তা ছিল নজিরবিহীন। কোনো প্রকার রাজনৈতিক সমঝোতা বা ক্ষমতার প্রলোভন তাঁকে রাজপথ থেকে সরাতে পারেনি। ১৯৮৭ সাল থেকে শুরু হওয়া ‘এরশাদ হটাও’ এক দফা আন্দোলনে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব ১৯৯১ সালে দেশে গণতন্ত্রের নতুন সূর্যোদয় ঘটায়। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

বেগম জিয়া কেবল মাঠের নেত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নারী শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত; তিনি দুইবার দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ‘সার্ক’-এর চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর একটি অনন্য ও বিরল রেকর্ড রয়েছে—তিনি পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন এবং প্রতিটি আসনেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নেতার এমন অবিস্মরণীয় রেকর্ড আর নেই।

বেগম জিয়ার পুরো জীবনটাই ছিল ত্যাগের এক বিশাল ক্যানভাস। ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৭ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বারবার গ্রেপ্তার হন। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত সরকারের সময় যখন তাঁকে দেশত্যাগের জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়, তখন তিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, “বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই, দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা।” এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে তাঁর দেশপ্রেমের গভীরতা।

পরবর্তী ১৫ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়েছে চরমভাবে। ৩৭টি মামলা এবং টানা সাত বছরের কারাবন্দি জীবন তাঁর শারীরিক অবস্থাকে নাজুক করে দিলেও তাঁর আদর্শকে দমাতে পারেনি। ২০১০ সালে তাঁকে তাঁর দীর্ঘ ২৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাসের বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, যা ছিল এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। তবুও তিনি মাথা নত করেননি।

বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেত্রী হিসেবে নন, বরং বাংলাদেশের মানুষের কাছে হার না মানা দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে বেঁচে থাকবেন। নির্যাতন, কারাবাস ও শারীরিক অসুস্থতা—কোনো কিছুই তাঁর গণতান্ত্রিক চেতনাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। দেশ, মাটি ও মানুষের প্রশ্নে তাঁর এই আপসহীন মানসিকতা তাঁকে ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে প্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—বাংলাদেশের রাজনীতির এক ‘আপসহীন মহীয়সী’ হিসেবে।