০৭:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

অপপ্রচার ও ব্যক্তিগত আক্রমণের বিপরীতে এক অটল হিমালয় ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কণ্টকাকীর্ণ অথচ মহিমান্বিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। আপনার বিশ্লেষণে উঠে আসা তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিপরীতে তাঁর মার্জিত অবস্থানের বিষয়টি ইতিহাসের এক অকাট্য দলিল।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ধৈর্য ও সহনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ। চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্রহনন এবং বিউটি শেইমিংয়ের শিকার হয়েছেন, তা আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ও অত্যন্ত লজ্জাজনক। তবে পাহাড়সম এই অশ্লীল অপপ্রচারের বিপরীতে তাঁর পাহাড়সম নীরবতা ও মার্জিত অবস্থান তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিউটি শেইমিংয়ের শিকার

বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের অনুসারীরা বারবার তাঁর ব্যক্তিগত রুচি ও সাজগোজকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। খোদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার মেকআপ, লিপস্টিক ও ভ্রু প্লাক করা নিয়ে প্রকাশ্যে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে তাঁকে একজন ‘বিলাসী ও অন্তঃসারশূন্য’ নারী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই সময় নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকা তথাকথিত নারীবাদী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই চরম ‘স্লাটশেইমিং’ বা চরিত্রহননের বিরুদ্ধে টু শব্দটি পর্যন্ত করেননি।

ব্যক্তিগত গ্লানিকে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর

খালেদা জিয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রতিপক্ষ সব সময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। কিন্তু তিনি এই হীনম্মন্যতাকে গায়ে না মেখে কাজের মাধ্যমে তার মোক্ষম জবাব দিয়েছেন। যে নেত্রীকে শিক্ষার অভাব নিয়ে খোঁটা দেওয়া হয়েছে, সেই নেত্রীই ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার সাহসী ঘোষণা দিয়েছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ায় নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর প্রবর্তিত ‘উপবৃত্তি প্রথা’ ছিল এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। আজ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নারী জাগরণের যে জোয়ার দেখা যাচ্ছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এই খালেদা জিয়াই। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ডিগ্রির চেয়ে দেশের মানুষের প্রতি দরদ থাকা অনেক বেশি জরুরি।

অসীম ধৈর্য ও মার্জিত ব্যক্তিত্ব

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর অসীম ধৈর্য। তাঁকে নিয়ে নির্মিত নোংরা প্যারোডি গান, ব্যঙ্গচিত্র এবং তৎকালীন মন্ত্রীদের কুরুচিপূর্ণ গালাগালির বিপরীতে তিনি কখনো পাল্টা আক্রমণ করেননি। শেখ হাসিনা যখন তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করেছেন, খালেদা জিয়া কখনোই সেই নিচু স্তরে নেমে কোনো মন্তব্য করেননি। এমনকি জীবনের শেষ দিনগুলোতে যখন তিনি কারাবন্দী অবস্থায় সুচিকিৎসার অভাবে ধুঁকছিলেন, তখনও তাঁর ব্যক্তিত্বে কোনো ভাঙন দেখা দেয়নি। সকল অশ্লীল অপপ্রচারের জবাব তিনি দিয়েছেন তাঁর মার্জিত উপস্থিতি এবং নীরবতার মাধ্যমে।

ইতিহাসের বিচার ও উত্তরসূরি

বেগম খালেদা জিয়া আজ বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর ওপর করা এই অবিচার ও অশ্লীল আক্রমণগুলো বাংলাদেশের রাজনীতির গায়ে এক চিরস্থায়ী কলঙ্ক হয়ে থাকবে। তাঁকে নিয়ে করা প্রতিটি বিদ্রূপ আজ তাঁর অটল ব্যক্তিত্বের কাছে পরাজিত হয়েছে। আজ দেশের কোটি কোটি নারী, যারা তাঁর প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার সুফল ভোগ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে, তারাই বেগম খালেদা জিয়ার শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক উত্তরসূরি। এই শিক্ষিত নারী সমাজই হবে তাঁর প্রতি হওয়া সব অপমানের জীবন্ত প্রতিবাদ।


“বেগম খালেদা জিয়া মানেই এক অপরাজিত নেত্রী, যিনি ব্যক্তিগত অপমানের কাদা সরিয়ে দেশের মানুষের জন্য আলোর পথ তৈরি করে গেছেন।”

জনপ্রিয়

অপপ্রচার ও ব্যক্তিগত আক্রমণের বিপরীতে এক অটল হিমালয় ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া

প্রকাশিত : ০১:২৯:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক কণ্টকাকীর্ণ অথচ মহিমান্বিত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। আপনার বিশ্লেষণে উঠে আসা তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিপরীতে তাঁর মার্জিত অবস্থানের বিষয়টি ইতিহাসের এক অকাট্য দলিল।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন ধৈর্য ও সহনশীলতার এক অনন্য উদাহরণ। চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্রহনন এবং বিউটি শেইমিংয়ের শিকার হয়েছেন, তা আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশ্বের ইতিহাসে বিরল ও অত্যন্ত লজ্জাজনক। তবে পাহাড়সম এই অশ্লীল অপপ্রচারের বিপরীতে তাঁর পাহাড়সম নীরবতা ও মার্জিত অবস্থান তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও বিউটি শেইমিংয়ের শিকার

বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের অনুসারীরা বারবার তাঁর ব্যক্তিগত রুচি ও সাজগোজকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। খোদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার মেকআপ, লিপস্টিক ও ভ্রু প্লাক করা নিয়ে প্রকাশ্যে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে তাঁকে একজন ‘বিলাসী ও অন্তঃসারশূন্য’ নারী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই সময় নারী অধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকা তথাকথিত নারীবাদী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই চরম ‘স্লাটশেইমিং’ বা চরিত্রহননের বিরুদ্ধে টু শব্দটি পর্যন্ত করেননি।

ব্যক্তিগত গ্লানিকে জাতীয় সম্পদে রূপান্তর

খালেদা জিয়ার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রতিপক্ষ সব সময় তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। কিন্তু তিনি এই হীনম্মন্যতাকে গায়ে না মেখে কাজের মাধ্যমে তার মোক্ষম জবাব দিয়েছেন। যে নেত্রীকে শিক্ষার অভাব নিয়ে খোঁটা দেওয়া হয়েছে, সেই নেত্রীই ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার সাহসী ঘোষণা দিয়েছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ায় নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর প্রবর্তিত ‘উপবৃত্তি প্রথা’ ছিল এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। আজ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে নারী জাগরণের যে জোয়ার দেখা যাচ্ছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এই খালেদা জিয়াই। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ডিগ্রির চেয়ে দেশের মানুষের প্রতি দরদ থাকা অনেক বেশি জরুরি।

অসীম ধৈর্য ও মার্জিত ব্যক্তিত্ব

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর অসীম ধৈর্য। তাঁকে নিয়ে নির্মিত নোংরা প্যারোডি গান, ব্যঙ্গচিত্র এবং তৎকালীন মন্ত্রীদের কুরুচিপূর্ণ গালাগালির বিপরীতে তিনি কখনো পাল্টা আক্রমণ করেননি। শেখ হাসিনা যখন তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করেছেন, খালেদা জিয়া কখনোই সেই নিচু স্তরে নেমে কোনো মন্তব্য করেননি। এমনকি জীবনের শেষ দিনগুলোতে যখন তিনি কারাবন্দী অবস্থায় সুচিকিৎসার অভাবে ধুঁকছিলেন, তখনও তাঁর ব্যক্তিত্বে কোনো ভাঙন দেখা দেয়নি। সকল অশ্লীল অপপ্রচারের জবাব তিনি দিয়েছেন তাঁর মার্জিত উপস্থিতি এবং নীরবতার মাধ্যমে।

ইতিহাসের বিচার ও উত্তরসূরি

বেগম খালেদা জিয়া আজ বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর ওপর করা এই অবিচার ও অশ্লীল আক্রমণগুলো বাংলাদেশের রাজনীতির গায়ে এক চিরস্থায়ী কলঙ্ক হয়ে থাকবে। তাঁকে নিয়ে করা প্রতিটি বিদ্রূপ আজ তাঁর অটল ব্যক্তিত্বের কাছে পরাজিত হয়েছে। আজ দেশের কোটি কোটি নারী, যারা তাঁর প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থার সুফল ভোগ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে, তারাই বেগম খালেদা জিয়ার শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক উত্তরসূরি। এই শিক্ষিত নারী সমাজই হবে তাঁর প্রতি হওয়া সব অপমানের জীবন্ত প্রতিবাদ।


“বেগম খালেদা জিয়া মানেই এক অপরাজিত নেত্রী, যিনি ব্যক্তিগত অপমানের কাদা সরিয়ে দেশের মানুষের জন্য আলোর পথ তৈরি করে গেছেন।”