দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আগামী মাস নভেম্বরের মধ্যেই দেশে ফিরতে চলেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের ঘনিষ্ঠ সূত্র ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের (২৪ অক্টোবর গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য) ঘোষণার পর তার এই প্রত্যাবর্তন শুধু বিএনপির রাজনীতিতেই নয়, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচনা করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১. প্রত্যাবর্তনের প্রেক্ষাপট ও দীর্ঘ ১৪ মাসের কৌতুহল
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ ১৪ মাস পেরিয়ে গেলেও তারেক রহমানের দেশে না ফেরা নিয়ে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক কৌতুহল ছিল। তার এই অনুপস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকে দায়ী করা হচ্ছিল।একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যানুসারে, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকাতে একটি পার্শ্ববর্তী দেশ মরিয়া হয়ে উঠেছে। কেবল পার্শ্ববর্তী দেশের ষড়যন্ত্রই নয়, পতিত আওয়ামী লীগ, দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল বলে তথ্য রয়েছে। এ কারণেই পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অধিকাংশ শীর্ষ নেতা তার দেশে ফেরায় মত দেননি।
২. দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তার উদ্বেগ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তারেক রহমানের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের পেছনে দক্ষিণ এশিয়ার অস্থির রাজনৈতিক ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন। এই অঞ্চলে জাতীয় নেতাদের হত্যাকাণ্ড বা হত্যাচেষ্টা একটি রক্তক্ষয়ী বাস্তবতা। ভারতে মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, রাজিব গান্ধী; পাকিস্তানে লিয়াকত আলী খান, বেনজির ভুট্টো; শ্রীলঙ্কায় সলোমন বন্দরনায়েক, রণসিংহে প্রেমদাসা এবং বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। নির্বাচন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক পরিস্থিতি ও সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কাই তারেক রহমানের নিরাপত্তা উদ্বেগকে বাড়িয়েছে।
৩. বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নেতৃত্বের অপরিহার্যতা
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের নেতৃত্বের শূন্যতা বিরাজ করছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ভারতে পলাতক এবং তার দল নেতৃত্বশূন্য। অন্যদিকে, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থতার কারণে নিষ্ক্রিয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গ্রহণযোগ্যতা সাধারণ মানুষের কাছে এখনো সীমিত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কাজটি করার মতো একমাত্র যোগ্য নেতা তারেক রহমান। তারেক রহমান দেশের জাতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে আওয়ামী লীগসহ বিএনপি বিমুখ দলগুলো।
৪. জাতীয়তাবাদী চেতনা ও ভারতের প্রতি স্পষ্ট অবস্থান
গত ৭ অক্টোবর বিবিসি বাংলায় দেওয়া তারেক রহমানের সাক্ষাৎকারটি তার জাতীয়তাবাদী চেতনা ও পররাষ্ট্রনীতিতে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে, যা তাকে দেশি-বিদেশি নানা গোষ্ঠীর চক্ষুশূলে পরিণত করেছে। “কূটনীতির ক্ষেত্রে বিএনপির নীতি সবার আগে বাংলাদেশ। আমার জনগণ, আমার দেশ, আমার সার্বভৌমত্ব। এটিকে অক্ষুন্ন রেখে, এটি স্বার্থ বিবেচনা করে, এই স্বার্থ অটুট রেখে বাকি সবকিছু।” তিনি ভারত সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্টবাদী হয়ে বলেছেন, “অবশ্যই আমি আমার পানির হিস্যা চাই। অবশ্যই আমি দেখতে চাই না যে, আরেক ফেলানী ঝুলে আছে। অবশ্যই আমরা এটা মেনে নেবো না।” এই বক্তব্য তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে দেশের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশাকে প্রতিফলিত করে।এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বিএনপির উদ্যোগে রংপুর বিভাগের পাঁচটি জেলায় ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাও’ শিরোনামে মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা জনমানুষের কাছে বিএনপিকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
৫. নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও সরকারি সহযোগিতা
তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে তার ও খালেদা জিয়ার জন্য নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যাতে সরকারের ইতিবাচক সহায়তার ইঙ্গিত রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার জন্য দুটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি কেনার অনুমতি দিয়েছে (প্রথমটি জুনে ও দ্বিতীয়টি অক্টোবরের শুরুতে)। গাড়িগুলো জাপান থেকে আমদানির বিষয়ে আলোচনা চলছে।বিএনপি একটি শটগান ও দুটি পিস্তলের লাইসেন্সের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গেও নিরাপত্তা বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে এবং তাকে বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়ার নিশ্চয়তাও মিলেছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।দেশে ফিরে তিনি গুলশানের ৭৯ ও ১৯৬ নম্বর দুটি বাসা মিলিয়ে থাকবেন, যেখানে ইতোমধ্যে সংস্কারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
৬. প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
তারেক রহমান ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন এবং বর্তমানে সেখানে ইনডেফিনিট লিভ টু রিমেইন (আইএলআর) স্ট্যাটাসে বসবাস করছেন।যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে তার ট্রাভেল পাস ইস্যুসহ সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করবে। তার অনুপস্থিতিতে যে নেতৃত্ব শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল, দেশে ফিরে তার সরাসরি নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীরা নতুনভাবে গতি ফিরে পাবেন। তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে এবং তারা আরও ঐক্যবদ্ধ হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দলের নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবেন এবং দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তার নেতৃত্ব জরুরি হয়ে উঠবে।
তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন কেবল বিএনপির নয়, সমগ্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে। এই আগমনকে ঘিরে সরকারের প্রতিক্রিয়া, আন্তর্জাতিক মহলের পর্যবেক্ষণ এবং দেশের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ—সবকিছুই আগামী দিনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









