০৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
নতুন করে মতবিরোধ

জুলাই জাতীয় সনদ বিতর্ক: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে সুপারিশ জমা

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের (জাক) সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ জমা দেওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে এই মতপার্থক্য রাজনৈতিক ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

বিতর্ক জিইয়ে রাখল জুলাই সনদ

জুলাই জাতীয় সনদ ও সুপারিশের মূল তথ্য

৩৩টি দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনার পর সংবিধানসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি হয়। গত ১৭ অক্টোবর ২৫টি দল ও জোট এতে স্বাক্ষর করে সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে। সুশাসন, গণতন্ত্র, ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।ঐকমত্য কমিশন দীর্ঘ আলোচনা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে সনদের বাস্তবায়নের আদেশের একটি খসড়া (‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’) অন্তর্বর্তী সরকারকে জমা দিয়েছে। এতে সরকারকে তিনটি ভাগে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান ও বিতর্ক

বিএনপি সনদ বাস্তবায়নের খসড়ায় স্বাক্ষরিত সনদ বহির্ভূত অনেক পরামর্শ/সুপারিশ যুক্ত করেছিল। ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর ধারণাটি আগে কমিশনে আলোচিত বা ঐকমত্য হয়নি।  সুপারিশগুলো জাতিতে বিভক্তি আনবে, ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবে না।  কমিশন ‘প্রতারণা’ করেছে, কারণ তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) উপেক্ষা করা হয়েছে। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে “সংবিধান সংস্কার পরিষদের নামে একটা নতুন বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে… যেটা আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে কখনো টেবিলে ছিল না, আলোচিত হয়নি। এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্য হয়নি।”

জামায়াতে ইসলামী কমিশনের সুপারিশকে ‘ইতিবাচক’ দেখছে।  অবিলম্বে আদেশ জারি ও নভেম্বরের মধ্যে গণভোটের মাধ্যমে আইনি ভিত্তি দেওয়ার জোরালো দাবী তাদের। গণভোটের তারিখ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সরকারকে দ্রুত তারিখ ঘোষণা করে সংকটমুক্ত করতে হবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সুপারিশের বেশ কিছু দিক ইতিবাচক আছে, যেমন: গণভোটে ‘নোট অব ডিসেন্টের’ কার্যকারিতা না রাখা, পুরো সনদকে ‘হ্যাঁ’/’না’ ফরম্যাটে গণভোটে দেওয়া, এবং ২৭০ দিনের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ রাখা। বিএনপির অসন্তুষ্টি প্রসঙ্গে এনসিপি’র অভিমত হলো বিএনপি যেসব বিষয়ে সংখ্যালঘু ছিল (যেমন উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি), সেগুলোকে অনৈক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। গণভোট জাতীয় নির্বাচনের আগে হওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন—রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও স্বাক্ষরের পর আলাপ না করে কেন এমন বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলো? স্বাক্ষরিত সনদে না থাকা সত্ত্বেও এটিকে সুপারিশে যুক্ত করা হয়েছে, যা ঐকমত্য কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সংকটের মূল কারণ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কৌশল ও পদ্ধতি নিয়ে প্রধান দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করছে। বিশেষ করে সনদ বাস্তবায়নের শর্ত, গণভোটের সময়সীমা এবং সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে এই মতবিরোধ প্রকট। বিএনপি’র অভিযোগ, ঐকমত্য কমিশন তাদের ভিন্নমতকে উপেক্ষা করেছে এবং স্বাক্ষরিত সনদের বাইরে নতুন বিষয় যুক্ত করেছে, যা কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে ‘বল’ এখন অন্তর্বর্তী সরকারের কোর্টে, যাদেরকে দ্রুত নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও গণভোটের সময়সীমা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক নিরসন করতে হবে।

সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

২৭০ দিনের জন্য একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করলে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতার কাঠামো এবং আসন্ন নির্বাচনের আগে ক্ষমতার ভারসাম্যে এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। যদিও এনসিপি এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে, তবে গণভোটের আগে এই ধারণার উত্থান রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করছে। জামায়াতে ইসলামীও গণভোটের তারিখ দ্রুত ঘোষণার মাধ্যমে আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে, কারণ তারা মনে করে পরিষদের কার্যকারিতা গণভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

 

জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে আয়ারল্যান্ডের বিশাল সংগ্রহ, টেক্টরের বিধ্বংসী ইনিংস

নতুন করে মতবিরোধ

জুলাই জাতীয় সনদ বিতর্ক: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে সুপারিশ জমা

প্রকাশিত : ০১:১৭:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৫

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের (জাক) সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ জমা দেওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে এই মতপার্থক্য রাজনৈতিক ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।

বিতর্ক জিইয়ে রাখল জুলাই সনদ

জুলাই জাতীয় সনদ ও সুপারিশের মূল তথ্য

৩৩টি দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনার পর সংবিধানসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি হয়। গত ১৭ অক্টোবর ২৫টি দল ও জোট এতে স্বাক্ষর করে সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে। সুশাসন, গণতন্ত্র, ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।ঐকমত্য কমিশন দীর্ঘ আলোচনা ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে সনদের বাস্তবায়নের আদেশের একটি খসড়া (‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’) অন্তর্বর্তী সরকারকে জমা দিয়েছে। এতে সরকারকে তিনটি ভাগে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান ও বিতর্ক

বিএনপি সনদ বাস্তবায়নের খসড়ায় স্বাক্ষরিত সনদ বহির্ভূত অনেক পরামর্শ/সুপারিশ যুক্ত করেছিল। ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর ধারণাটি আগে কমিশনে আলোচিত বা ঐকমত্য হয়নি।  সুপারিশগুলো জাতিতে বিভক্তি আনবে, ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবে না।  কমিশন ‘প্রতারণা’ করেছে, কারণ তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) উপেক্ষা করা হয়েছে। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে “সংবিধান সংস্কার পরিষদের নামে একটা নতুন বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে… যেটা আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে কখনো টেবিলে ছিল না, আলোচিত হয়নি। এ বিষয়ে কোনো ঐকমত্য হয়নি।”

জামায়াতে ইসলামী কমিশনের সুপারিশকে ‘ইতিবাচক’ দেখছে।  অবিলম্বে আদেশ জারি ও নভেম্বরের মধ্যে গণভোটের মাধ্যমে আইনি ভিত্তি দেওয়ার জোরালো দাবী তাদের। গণভোটের তারিখ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। সরকারকে দ্রুত তারিখ ঘোষণা করে সংকটমুক্ত করতে হবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সুপারিশের বেশ কিছু দিক ইতিবাচক আছে, যেমন: গণভোটে ‘নোট অব ডিসেন্টের’ কার্যকারিতা না রাখা, পুরো সনদকে ‘হ্যাঁ’/’না’ ফরম্যাটে গণভোটে দেওয়া, এবং ২৭০ দিনের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ রাখা। বিএনপির অসন্তুষ্টি প্রসঙ্গে এনসিপি’র অভিমত হলো বিএনপি যেসব বিষয়ে সংখ্যালঘু ছিল (যেমন উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি), সেগুলোকে অনৈক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। গণভোট জাতীয় নির্বাচনের আগে হওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান প্রশ্ন তুলেছেন—রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও স্বাক্ষরের পর আলাপ না করে কেন এমন বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হলো? স্বাক্ষরিত সনদে না থাকা সত্ত্বেও এটিকে সুপারিশে যুক্ত করা হয়েছে, যা ঐকমত্য কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সংকটের মূল কারণ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কৌশল ও পদ্ধতি নিয়ে প্রধান দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করছে। বিশেষ করে সনদ বাস্তবায়নের শর্ত, গণভোটের সময়সীমা এবং সংস্কারের পদ্ধতি নিয়ে এই মতবিরোধ প্রকট। বিএনপি’র অভিযোগ, ঐকমত্য কমিশন তাদের ভিন্নমতকে উপেক্ষা করেছে এবং স্বাক্ষরিত সনদের বাইরে নতুন বিষয় যুক্ত করেছে, যা কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে ‘বল’ এখন অন্তর্বর্তী সরকারের কোর্টে, যাদেরকে দ্রুত নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও গণভোটের সময়সীমা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক নিরসন করতে হবে।

সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

২৭০ দিনের জন্য একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করলে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতার কাঠামো এবং আসন্ন নির্বাচনের আগে ক্ষমতার ভারসাম্যে এটি কী ধরনের প্রভাব ফেলবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। যদিও এনসিপি এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে, তবে গণভোটের আগে এই ধারণার উত্থান রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করছে। জামায়াতে ইসলামীও গণভোটের তারিখ দ্রুত ঘোষণার মাধ্যমে আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে, কারণ তারা মনে করে পরিষদের কার্যকারিতা গণভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।