শিক্ষাসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রাচীন নগরী ময়মনসিংহে যানজট এখন নিত্যদিনের অসহনীয় দুর্ভোগ। জনসংখ্যা ও যানবাহনের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে শহরটি যেন ‘যানজটের শহর’ বা ‘ধীরগতির দুর্গ’-এ পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় যান চলাচলের গতির দিক থেকে ময়মনসিংহকে বিশ্বের ধীরগতির শহরের তালিকার মধ্যে স্থান দেওয়া হয়েছে।
🚦 তীব্র যানজটের প্রধান কারণ
ময়মনসিংহ শহরে যানজটের পেছনে একাধিক মৌলিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে:
- অপ্রশস্ত সড়ক ও অপরিকল্পিত নগরায়ন: দুই শত বছরের প্রাচীন এই নগরের সড়কগুলো অত্যন্ত সরু। গত ৪০ বছরে যানবাহন বহুগুণ বাড়লেও প্রধান প্রধান রাস্তা ১ ইঞ্চিও বৃদ্ধি পায়নি। অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ ও সড়কের পাশে যত্রতত্র বিদ্যুত ও টিএন্ডটির খুঁটি থাকায় রাস্তা আরও সংকুচিত হয়েছে।
- অনিয়ন্ত্রিত অযান্ত্রিক ও তিন চাকার যান: ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা শহরে মাত্রাতিরিক্ত। সিটি করপোরেশনের হিসাবে অনুমোদিত ইজিবাইক ও রিকশার সংখ্যা নির্দিষ্ট হলেও বাস্তবে এর দ্বিগুণ বা তারও বেশি অযান্ত্রিক যান চলাচল করে।
- রেলপথ ও রেলক্রসিং: শহরের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া রেলপথ ও প্রায় ১০ থেকে ১১টি রেলক্রসিং যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। দিনে প্রায় ৫০ বারের মতো ট্রেন যাতায়াত করায় প্রতিবার ৮ থেকে ১০ মিনিট করে যান চলাচল বন্ধ থাকে, যা সারা নগরে যানজট ছড়িয়ে দেয়।
- ফুটপাত দখল ও যত্রতত্র স্ট্যান্ড: সড়কের ফুটপাত হকার ও দোকানদারদের দখলে থাকায় পথচারীরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া সড়কের পাশে যত্রতত্র দোকানপাট ও বাস/অটোরিকশার স্ট্যান্ড থাকায় যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।
- আন্তঃজেলা যানবাহনের চাপ: ঢাকা, জামালপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুরসহ বিভিন্ন জেলার দূরপাল্লার বাস ও ব্রহ্মপুত্র নদের অপর পারের সাতটি উপজেলার বাস-ট্রাক শহরের ভেতর দিয়ে চলাচল করে।
- বাসস্ট্যান্ড শহরের ভেতরে থাকা: ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ডসহ কয়েকটি বাসস্ট্যান্ড শহরের ভেতর থেকে পুরোপুরি না সরানোর কারণেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ রুটে যানজট লেগেই থাকে।
শহরের চরপাড়া মোড়,গাঙ্গিনারপাড় মোড্,নতুন বাজার মোড্,জিলা স্কুল মোড়, টাউন হল মোড়, পাটগুদাম ব্রিজ মোড়, কেওয়াটখালী, শম্ভুগঞ্জ এলাকার চায়না মোড় (বাইপাস মোড় পর্যন্ত) এই এলাকাগুলোতে যানজট প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক।যানজটের কারণে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। কয়েক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে, যার ফলে মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। জরুরি লেন না থাকায় যানজটে অ্যাম্বুলেন্সসহ মুমূর্ষু রোগী নিয়ে গাড়ি পড়ে থাকছে।
🛠️ সমাধানের উদ্যোগ ও প্রত্যাশা
- সেতু নির্মাণ: ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর কেওয়াটখালী সেতু এবং রহমতপুর আর্চ স্টিল ব্রিজ নির্মিত হলে আন্তঃজেলা যানবাহনের চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
- বাসস্ট্যান্ড সরিয়ে নেওয়া: শালবন বাসস্ট্যান্ডসহ কয়েকটি বাসস্ট্যান্ড শহর থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- রেলপথ অপসারণের দাবি: নগরীর ভেতর দিয়ে যাওয়া রেলপথ সরিয়ে বাইপাস করে নতুন রাস্তা নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
জনগণের প্রত্যাশা, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন এবং ট্রাফিক বিভাগ সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সুপ্রশস্ত সড়ক নির্মাণ, বিকল্প রুট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং অযান্ত্রিক যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে এই যানজটের ভোগান্তি থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 














