একসময় শিক্ষাসংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহ শহরে বর্তমানে কোচিং বাণিজ্য শিক্ষার মূল স্রোতের সমান্তরালে একটি শক্তিশালী ও রমরমা ব্যবসায়িক কাঠামোর জন্ম দিয়েছে। এটি একদিকে যেমন অভিভাবকদের ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষার গুণগত মান এবং শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করছে। তবে এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য গঠনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
⚠️ কোচিং বাণিজ্যের মূল কারণসমূহ
ময়মনসিংহের কোচিং বাণিজ্যের বিস্তারের পেছনে প্রধানত তিনটি পক্ষের দুর্বলতা কাজ করছে:
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের ভূমিকা:
- শ্রেণিকক্ষে অমনোযোগিতা: অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, মূল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা ঠিকমতো পড়াচ্ছেন না বা দ্রুত সিলেবাস শেষ করে দিচ্ছেন, যাতে শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে যেতে বাধ্য হয়।
- সরকারি নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন: সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের কিছু শিক্ষক মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কোচিং বা প্রাইভেট বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, যা সরকারী নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
- অপর্যাপ্ত তদারকি: স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষ এই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হওয়ায় কোচিংয়ের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে।
- অভিভাবকদের মনোভাব:
- অসুস্থ প্রতিযোগিতা: ভালো ফলাফলের (জিপিএ-৫) জন্য অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা কাজ করে। তারা মনে করেন, কোচিং বা প্রাইভেট ছাড়া সন্তানেরা ভালো ফল করতে পারবে না, ফলে বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করছেন।
- নতুন কারিকুলামের সঙ্গে অ-অভ্যস্ততা: অনেকে নতুন শিক্ষাক্রম বুঝতে না পেরে কোচিংয়ের উপর নির্ভর করছেন।
- অন্যান্য পক্ষ:
- শিক্ষিত বেকারত্ব: বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা চাকরির সুযোগ না পেয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য অল্প টাকায় কোচিং বা প্রাইভেট বাণিজ্যে যুক্ত হচ্ছেন।
- অবকাঠামোগত সমস্যা: শহরের বাউন্ডারি রোড, নাহা রোড বা জিলা স্কুল রোডের মতো ঘিঞ্জি বা অনুপযোগী স্থানেও ছোট ছোট কোচিং সেন্টার চলছে, যেখানে পড়াশোনার পরিবেশ নেই।
💡 গঠনমূলক সমাধান ও উত্তরণের পথ
ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে এবং কোচিং-নির্ভরতা কমাতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য:
১. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা
- শ্রেণিকক্ষের মান নিশ্চিতকরণ: স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে যেন শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে ১০০% আন্তরিক ও মনোযোগী হন।
- শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক উন্নয়ন: শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষকের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যে যুক্ত হওয়া বন্ধ করতে আইনি প্রক্রিয়ায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
- বিশেষ সহায়তা ক্লাস: দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল প্রাঙ্গণে বিনামূল্যে অতিরিক্ত সহায়তা ক্লাস (Remedial Classes) চালু করা, যাতে কোচিংয়ের প্রয়োজন না হয়।
২. প্রশাসনিক তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ
- নিয়মিত অভিযান পরিচালনা: জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বোর্ডকে নিয়ে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা এবং সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘনকারী কোচিং সেন্টার ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
- স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন: কোচিং সেন্টার পরিচালনার জন্য একটি স্বচ্ছ নীতিমালা তৈরি করা, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অবকাঠামোগত মানদণ্ড নির্ধারণ করা থাকবে।
- বেকারদের বিকল্প কর্মসংস্থান: শিক্ষিত বেকারদের জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা বা তাদের যুক্ত করে স্কুল-ভিত্তিক টিউটরিং প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে।
৩. সচেতনতা বৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন
- অভিভাবক কাউন্সিলিং: অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যে, কেবল মুখস্থনির্ভর জিপিএ-৫ নয়, বরং শিক্ষার্থীদের সুষম বিকাশ, সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা অর্জনই আসল লক্ষ্য।
- শিক্ষা পদ্ধতির আধুনিকীকরণ: মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে আউটকাম-ভিত্তিক মূল্যায়ন এবং নতুন শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নে শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
- সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম সক্রিয়করণ: খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক ও বিজ্ঞান ক্লাবগুলোকে সক্রিয় করে শিক্ষার্থীদের স্কুলের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো, যাতে তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেবল পরীক্ষার প্রস্তুতি কেন্দ্র না ভাবে।
ময়মনসিংহ শিক্ষানগরীর মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রোধ করে এটিকে একটি মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক সেবায় পরিণত করাই হোক আমাদের লক্ষ্য।
নিজস্ব প্রতিবেদক 










