০৪:৩৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষঃরায় ২০ নভেম্বর

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক এবং আইনি প্রক্রিয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল অধ্যায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি মূলত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরকালীন সময়ে একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তবে এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে।

এই সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অ্যাডভোকেট এম সলিম উল্লাহসহ তিনজন আইনজীবী ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানির পর ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগ সেই রিটটি খারিজ করে দেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করেন।

হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রিট আবেদনকারী পক্ষ সরাসরি আপিলের অনুমতি পায় এবং ২০০৫ সালে আপিল করে। এই আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে এক যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। সেই রায়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি বাতিল ঘোষণা করা হয়।

আপিল বিভাগের এই রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস হয় এবং ৩ জুলাই এ–সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যত বিলুপ্ত হয়।

তবে এই বিলুপ্তির পরও আইনি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি থেমে থাকেনি। আপিল বিভাগের ২০১১ সালের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আবেদন করেন। অন্য আবেদনকারীরা ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান। পরবর্তীতে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে পৃথক আবেদন দাখিল করেন।

এই পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদনগুলোর শুনানি শেষে গত ২৭ আগস্ট আপিল বিভাগ আপিলের অনুমতি প্রদান করেন, যা এই বিতর্কের চূড়ান্ত আইনি ধাপের সূচনা করে।

চূড়ান্ত আপিল শুনানিটি শুরু হয় গত ২১ অক্টোবর এবং ধারাবাহিকভাবে চলে ২২, ২৩, ২৮, ২৯ অক্টোবর, ২, ৪, ৫ ও ৬ নভেম্বর। মাঝে একটি বিরতির পর মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) এই ১০ দিনের শুনানি সমাপ্ত হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বেঞ্চে এই গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

শুনানিতে ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ ৫ জনের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া, ইন্টারভেনার হিসেবে আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে আইনজীবী শিশির মনির, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে আইনজীবী এস এম শাহরিয়ার এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও রুহুল কুদ্দুস তাদের যুক্তি উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো আসাদুজ্জামান।

উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে আপিল বেঞ্চ আগামী ২০ নভেম্বর এই বহুল প্রত্যাশিত মামলার রায়ের জন্য দিন ধার্য করেছেন। এই রায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের আগামী রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে আয়ারল্যান্ডের বিশাল সংগ্রহ, টেক্টরের বিধ্বংসী ইনিংস

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরাতে চূড়ান্ত আপিল শুনানি শেষঃরায় ২০ নভেম্বর

প্রকাশিত : ০২:১৮:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক এবং আইনি প্রক্রিয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল অধ্যায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি মূলত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরকালীন সময়ে একটি নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তবে এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে।

এই সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অ্যাডভোকেট এম সলিম উল্লাহসহ তিনজন আইনজীবী ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানির পর ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগ সেই রিটটি খারিজ করে দেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করেন।

হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে রিট আবেদনকারী পক্ষ সরাসরি আপিলের অনুমতি পায় এবং ২০০৫ সালে আপিল করে। এই আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে এক যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। সেই রায়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি বাতিল ঘোষণা করা হয়।

আপিল বিভাগের এই রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপসহ বেশ কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এনে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাস হয় এবং ৩ জুলাই এ–সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যত বিলুপ্ত হয়।

তবে এই বিলুপ্তির পরও আইনি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি থেমে থাকেনি। আপিল বিভাগের ২০১১ সালের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আবেদন করেন। অন্য আবেদনকারীরা ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান। পরবর্তীতে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে পৃথক আবেদন দাখিল করেন।

এই পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদনগুলোর শুনানি শেষে গত ২৭ আগস্ট আপিল বিভাগ আপিলের অনুমতি প্রদান করেন, যা এই বিতর্কের চূড়ান্ত আইনি ধাপের সূচনা করে।

চূড়ান্ত আপিল শুনানিটি শুরু হয় গত ২১ অক্টোবর এবং ধারাবাহিকভাবে চলে ২২, ২৩, ২৮, ২৯ অক্টোবর, ২, ৪, ৫ ও ৬ নভেম্বর। মাঝে একটি বিরতির পর মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) এই ১০ দিনের শুনানি সমাপ্ত হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে আপিল বেঞ্চে এই গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

শুনানিতে ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ ৫ জনের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া, ইন্টারভেনার হিসেবে আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে আইনজীবী শিশির মনির, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে আইনজীবী এস এম শাহরিয়ার এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও রুহুল কুদ্দুস তাদের যুক্তি উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো আসাদুজ্জামান।

উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে আপিল বেঞ্চ আগামী ২০ নভেম্বর এই বহুল প্রত্যাশিত মামলার রায়ের জন্য দিন ধার্য করেছেন। এই রায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আনবে বলে আশা করা হচ্ছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের আগামী রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।