০৩:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
গেজেট প্রকাশ

আচরণবিধি ভাঙলে প্রার্থিতা বাতিলঃ নির্বাচন কমিশন

আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করেছে, যা সোমবার (১০ নভেম্বর) রাতে ইসি সচিব আখতার আহমেদ কর্তৃক প্রকাশিত হয়। এই নতুন আচরণবিধিতে প্রচারণার পদ্ধতি, সাজার বিধান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার নিয়ে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন ও কঠোরতা আনা হয়েছে।

নতুন বিধিমালায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা পাবে। এছাড়া, অন্যান্য বিধি না মানার জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং একই কারণে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক করবে।

প্রচারণার ক্ষেত্রে ইসি এবার পরিবেশ সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই বিধানে পোস্টারে প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যানার ও বিলবোর্ড ব্যবহার করা গেলেও তা হতে হবে পরিবেশবান্ধব। প্রচারে পলিথিন, রেকসিন এবং প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানারের ব্যবহারের ওপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়াও, আলোকসজ্জা বা সাজসজ্জার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে; তবে ডিজিটাল বিলবোর্ডে আলোর ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রচারের সময় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। একজন প্রার্থী তার সংসদীয় আসনে সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন, যার দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট ও প্রস্থ ৯ ফুটের বেশি হতে পারবে না।

যানবাহন সহকারে কোনো ধরনের মিছিল বা শোডাউন, মশাল মিছিল প্রভৃতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ে ও প্রচারের সময় কোনো ধরনের ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।

নতুন বিধিমালার একটি যুগান্তকারী দিক হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারের বিধান প্রবর্তন। তবে এক্ষেত্রে কিছু কঠোর নিয়মাবলী আরোপ করা হয়েছে। প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা দলের পক্ষ থেকে প্রচার শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্যাদি অবশ্যই রিটার্নিং অফিসারের নিকট দাখিল করতে হবে।

সবচেয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে। প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না। ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কাহারো চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচন সংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ সব প্রকার ক্ষতিকর কনটেন্ট বানানো ও প্রচার করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়াও, নির্বাচনী স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো কনটেন্ট শেয়ার ও প্রকাশ করার পূর্বে তার সত্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো দল বা প্রার্থী, ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন বা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে সম্পাদিত (এডিট) বা এআই দ্বারা তৈরি কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষপূর্ণ ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবে না।

অন্যান্য বিধির মধ্যে উল্লেখ্য, কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা, পথসভা, সভা-সমাবেশ বা কোনো প্রচারণা করতে পারবে না। ভোটার স্লিপ বিতরণের অনুমতি থাকলেও তাতে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করা যাবে না।

এছাড়াও, সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্বর্তীকালীন/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে তারা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নামতে পারবেন না। আচরণবিধি মেনে চলার জন্য প্রার্থী ও দলগুলোকে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।

এছাড়াও, প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের সংলাপ এবং সব প্রার্থীর এক মঞ্চে ইশতেহার ঘোষণার মতো নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। এতে রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আসনের সব প্রার্থীকে নিয়ে একদিনে তাদের ইশতেহার বা ঘোষণাপত্রগুলো পাঠ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই সামগ্রিক পরিবর্তনগুলো একটি স্বচ্ছ, নিয়মতান্ত্রিক ও পরিবেশবান্ধব নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত বহন করে।

জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে আয়ারল্যান্ডের বিশাল সংগ্রহ, টেক্টরের বিধ্বংসী ইনিংস

গেজেট প্রকাশ

আচরণবিধি ভাঙলে প্রার্থিতা বাতিলঃ নির্বাচন কমিশন

প্রকাশিত : ০২:৪৩:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর ২০২৫

আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করেছে, যা সোমবার (১০ নভেম্বর) রাতে ইসি সচিব আখতার আহমেদ কর্তৃক প্রকাশিত হয়। এই নতুন আচরণবিধিতে প্রচারণার পদ্ধতি, সাজার বিধান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার নিয়ে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন ও কঠোরতা আনা হয়েছে।

নতুন বিধিমালায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা পাবে। এছাড়া, অন্যান্য বিধি না মানার জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং একই কারণে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও নিয়মতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক করবে।

প্রচারণার ক্ষেত্রে ইসি এবার পরিবেশ সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই বিধানে পোস্টারে প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যানার ও বিলবোর্ড ব্যবহার করা গেলেও তা হতে হবে পরিবেশবান্ধব। প্রচারে পলিথিন, রেকসিন এবং প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানারের ব্যবহারের ওপর সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়াও, আলোকসজ্জা বা সাজসজ্জার ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে; তবে ডিজিটাল বিলবোর্ডে আলোর ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রচারের সময় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। একজন প্রার্থী তার সংসদীয় আসনে সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন, যার দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট ও প্রস্থ ৯ ফুটের বেশি হতে পারবে না।

যানবাহন সহকারে কোনো ধরনের মিছিল বা শোডাউন, মশাল মিছিল প্রভৃতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ে ও প্রচারের সময় কোনো ধরনের ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।

নতুন বিধিমালার একটি যুগান্তকারী দিক হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারের বিধান প্রবর্তন। তবে এক্ষেত্রে কিছু কঠোর নিয়মাবলী আরোপ করা হয়েছে। প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা দলের পক্ষ থেকে প্রচার শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্যাদি অবশ্যই রিটার্নিং অফিসারের নিকট দাখিল করতে হবে।

সবচেয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে। প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না। ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কাহারো চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচন সংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ সব প্রকার ক্ষতিকর কনটেন্ট বানানো ও প্রচার করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়াও, নির্বাচনী স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো কনটেন্ট শেয়ার ও প্রকাশ করার পূর্বে তার সত্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কোনো দল বা প্রার্থী, ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন বা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশ্যে সম্পাদিত (এডিট) বা এআই দ্বারা তৈরি কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষপূর্ণ ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবে না।

অন্যান্য বিধির মধ্যে উল্লেখ্য, কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা, পথসভা, সভা-সমাবেশ বা কোনো প্রচারণা করতে পারবে না। ভোটার স্লিপ বিতরণের অনুমতি থাকলেও তাতে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করা যাবে না।

এছাড়াও, সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্বর্তীকালীন/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে তারা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নামতে পারবেন না। আচরণবিধি মেনে চলার জন্য প্রার্থী ও দলগুলোকে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।

এছাড়াও, প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের সংলাপ এবং সব প্রার্থীর এক মঞ্চে ইশতেহার ঘোষণার মতো নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। এতে রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আসনের সব প্রার্থীকে নিয়ে একদিনে তাদের ইশতেহার বা ঘোষণাপত্রগুলো পাঠ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই সামগ্রিক পরিবর্তনগুলো একটি স্বচ্ছ, নিয়মতান্ত্রিক ও পরিবেশবান্ধব নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত বহন করে।