আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট তিনজনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা শুরু হয়েছে।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার পর এই রায় ঘোষণা শুরু হয়। রায়ের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৫৩।
-
রায়ের প্রথম অংশ পাঠ করেন বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
-
দ্বিতীয় অংশ পাঠ করেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
-
বর্তমানে রায়ের শেষাংশ পাঠ করছেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার।
মামলার সময়ক্রম ও আসামিরা
এই মামলার রায় ঘোষণার জন্য প্রথমত গত ২৩ অক্টোবর শুনানি শেষে ১৩ নভেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৩ নভেম্বর রায়ের দিন পরিবর্তন করে ১৭ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়।
মামলার আসামিরা হলেন: ১. শেখ হাসিনা (ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক প্রধানমন্ত্রী) ২. আসাদুজ্জামান খান কামাল (সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) ৩. চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন (পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বা আইজিপি)
তবে, গত ১০ জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের সময় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) হিসেবে আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত রয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। অন্যদিকে, পলাতক দুই আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন মো. আমির হোসেন।
আনীত পাঁচটি অভিযোগের সারসংক্ষেপ
এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে, যার বিবরণ নিম্নরূপ:
১. উসকানিমূলক বক্তব্য ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড: গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে উল্লেখ করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। এর ফলস্বরূপ, আসাদুজ্জামান খান, চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ তৎকালীন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসীরা ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ করে। এই হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে দেড় হাজার ছাত্র-জনতা নিহত হন এবং প্রায় ২৫ হাজার জন আহত হন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
২. মারণাস্ত্র ব্যবহার ও সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি: দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ দেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপি তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনীর মাধ্যমে এই নির্দেশ কার্যকর করেন। গত বছরের ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এএসএম মাকসুদ কামাল এবং ১৮ জুলাই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও রেকর্ডে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশের বিষয়টি জানা যায়। শেখ হাসিনার এই নির্দেশ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির মাধ্যমে সব বাহিনীর কাছে এবং আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর কাছে পৌঁছানো হয়। এই নির্দেশের আলোকেই মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। এর দায়ে ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির’ (সর্বোচ্চ দায়) আওতায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
৩. বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হত্যা: রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি আসাদুজ্জামান ও মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
৪. চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা: রাজধানীর চানখাঁরপুলে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও শেখ হাসিনার পাশাপাশি আসাদুজ্জামান ও মামুনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
৫. আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে হত্যা: আশুলিয়ায় নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে আগুনে পুড়িয়ে মারার ঘটনায়ও শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান ও মামুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 









