০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫

কারো অবস্থান আইনের ঊর্ধ্বে নয়ঃ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৭ নভেম্বর, সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য ঘোষিত রায়কে স্বাগত জানিয়ে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশের আদালত অত্যন্ত স্পষ্টতার সঙ্গে এই রায়টি দিয়েছে, যা কেবল দেশজুড়েই নয়, দেশের সীমানা পেরিয়েও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তাঁর মতে, এই দণ্ড ও সাজা একটি মৌলিক নীতিকে পুনর্ব্যক্ত করেছে: ক্ষমতা বা পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, কারো অবস্থান আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই রায়টি জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার মানুষের জন্য এবং যেসব পরিবার এখনো তাদের প্রিয়জন হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছে, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ আজ বছরের পর বছর ধরে নিপীড়নের কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনর্নির্মাণের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

ড. ইউনূস সাবেক সরকারের গুরুতর অপরাধের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাদের অপরাধ ছিল তরুণ এবং শিশুদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের আদেশ দেওয়া, যেখানে তাদের একমাত্র অস্ত্র ছিল তাদের কণ্ঠস্বর। এটি দেশের আইন এবং সরকার ও নাগরিকদের মধ্যেকার মৌলিক বন্ধন উভয়কেই লঙ্ঘন করেছে। তাঁর মতে, এই ধরনের কাজ বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক মূল্যবোধ, মর্যাদা, স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকারকে গভীরভাবে আঘাত করেছে।

বিবৃতিতে উঠে আসে গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের মর্মান্তিক চিত্র। ড. ইউনূস বলেন, এই সময়ে প্রায় ১,৪০০ জন মানুষের জীবন নিভে গেছে। তাঁরা কেবল সংখ্যা নন, তাঁরা ছিলেন ছাত্র, বাবা-মা এবং অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক। মাসব্যাপী সাক্ষ্যগ্রহণে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে কীভাবে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছিল, এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও হামলা করা হয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই রায়টি নিহতদের কষ্টকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে যে দেশের বিচারব্যবস্থা অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনবে।

প্রধান উপদেষ্টা মনে করেন, এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন জবাবদিহির বৈশ্বিক স্রোতে আবার যোগ দিচ্ছে। তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন সেইসব শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের, যারা পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল এবং অনেকে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিল। তিনি বলেন, ‘আমাদের আগামীকালের জন্য তারা তাদের আজকের দিনটি উৎসর্গ করেছে।’

ভবিষ্যতের পথ সম্পর্কে ড. ইউনূস বলেন, সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য কেবল আইনি জবাবদিহিই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের মধ্যে আস্থা পুনর্নির্মাণ করাও দরকার। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ কেন সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বের জন্য সবকিছুতে ঝুঁকি নেয়, তা বোঝা এবং সেই বিশ্বাসের যোগ্য একটি সিস্টেম তৈরি করা অপরিহার্য। আজকের এই রায় সেই বৃহত্তর যাত্রাপথেরই প্রথম পদক্ষেপ।

শেষে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো সাহস ও বিনয়ের সঙ্গে মোকাবেলা করবে। আইনের শাসন, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রতিটি মানুষের সম্ভাবনাকে মূল্য দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার শুধু টিকে থাকবে না—এদেশে তা প্রতিষ্ঠিত হবে, বিকশিত হবে এবং টিকে থাকবে।”

জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে আয়ারল্যান্ডের বিশাল সংগ্রহ, টেক্টরের বিধ্বংসী ইনিংস

কারো অবস্থান আইনের ঊর্ধ্বে নয়ঃ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস

প্রকাশিত : ০২:৩৯:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৭ নভেম্বর, সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সদ্য ঘোষিত রায়কে স্বাগত জানিয়ে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে বাংলাদেশের আদালত অত্যন্ত স্পষ্টতার সঙ্গে এই রায়টি দিয়েছে, যা কেবল দেশজুড়েই নয়, দেশের সীমানা পেরিয়েও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তাঁর মতে, এই দণ্ড ও সাজা একটি মৌলিক নীতিকে পুনর্ব্যক্ত করেছে: ক্ষমতা বা পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, কারো অবস্থান আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই রায়টি জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার মানুষের জন্য এবং যেসব পরিবার এখনো তাদের প্রিয়জন হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছে, তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ আজ বছরের পর বছর ধরে নিপীড়নের কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনর্নির্মাণের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

ড. ইউনূস সাবেক সরকারের গুরুতর অপরাধের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাদের অপরাধ ছিল তরুণ এবং শিশুদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের আদেশ দেওয়া, যেখানে তাদের একমাত্র অস্ত্র ছিল তাদের কণ্ঠস্বর। এটি দেশের আইন এবং সরকার ও নাগরিকদের মধ্যেকার মৌলিক বন্ধন উভয়কেই লঙ্ঘন করেছে। তাঁর মতে, এই ধরনের কাজ বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক মূল্যবোধ, মর্যাদা, স্থিতিশীলতা এবং ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকারকে গভীরভাবে আঘাত করেছে।

বিবৃতিতে উঠে আসে গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের মর্মান্তিক চিত্র। ড. ইউনূস বলেন, এই সময়ে প্রায় ১,৪০০ জন মানুষের জীবন নিভে গেছে। তাঁরা কেবল সংখ্যা নন, তাঁরা ছিলেন ছাত্র, বাবা-মা এবং অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক। মাসব্যাপী সাক্ষ্যগ্রহণে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে কীভাবে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছিল, এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও হামলা করা হয়েছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই রায়টি নিহতদের কষ্টকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং নিশ্চিত করেছে যে দেশের বিচারব্যবস্থা অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনবে।

প্রধান উপদেষ্টা মনে করেন, এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন জবাবদিহির বৈশ্বিক স্রোতে আবার যোগ দিচ্ছে। তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন সেইসব শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের, যারা পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল এবং অনেকে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিল। তিনি বলেন, ‘আমাদের আগামীকালের জন্য তারা তাদের আজকের দিনটি উৎসর্গ করেছে।’

ভবিষ্যতের পথ সম্পর্কে ড. ইউনূস বলেন, সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য কেবল আইনি জবাবদিহিই যথেষ্ট নয়, বরং প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের মধ্যে আস্থা পুনর্নির্মাণ করাও দরকার। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ কেন সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বের জন্য সবকিছুতে ঝুঁকি নেয়, তা বোঝা এবং সেই বিশ্বাসের যোগ্য একটি সিস্টেম তৈরি করা অপরিহার্য। আজকের এই রায় সেই বৃহত্তর যাত্রাপথেরই প্রথম পদক্ষেপ।

শেষে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন, “আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো সাহস ও বিনয়ের সঙ্গে মোকাবেলা করবে। আইনের শাসন, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রতিটি মানুষের সম্ভাবনাকে মূল্য দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার শুধু টিকে থাকবে না—এদেশে তা প্রতিষ্ঠিত হবে, বিকশিত হবে এবং টিকে থাকবে।”