০৩:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অপরিহার্য

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংস্কার: আন্তর্জাতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ও টেকসই সমাধানের রূপরেখা

গত এক যুগে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত দ্রুত বিস্তার লাভ করলেও নন-পারফর্মিং লোন (NPL), দুর্নীতি এবং দুর্বল তদারকির মতো অতীতের গঠনগত দুর্বলতার কারণে এর স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৩-২৫ সময়কালে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক (BB) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আইএমএফ (IMF), বিশ্বব্যাংকএডিবি (ADB)-এর পরামর্শে খাতটিকে স্থিতিশীল, প্রযুক্তিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ নীতিগত ও সাংগঠনিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে মুদ্রানীতি, তদারকি কাঠামো, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্তাবলি চালিত করছে।

১. আন্তর্জাতিক চাপ ও যোগ (IMF-এর ভূমিকা)

২০১৯ থেকে ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশ আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। এই তহবিল ছাড়ের শর্ত হিসেবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দ্রুত রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, মুদ্রানীতিগত শাসন এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য কাঠামোগত সংস্কারের দিকে মনোযোগ দিতে হয়েছে।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: আন্তর্জাতিক শর্তাদি মানা জরুরি হলেও, স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতাপ্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় না নিলে নীতিগুলো কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শর্ত বাস্তবায়নের জন্য ধারাবাহিক, স্বচ্ছ ও গৃহীত রোডম্যাপ অত্যাবশ্যক।

২. রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের (SOBs) সংস্কার ও পুনর্গঠন

দীর্ঘদিন ধরে SOBs-এর দুর্বলতা ব্যাংকিং খাতের সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রস্তাবিত সংস্কার প্যাকেজে SOBs-এর পুনর্গঠনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন ফ্রেমওয়ার্ক, ম্যানেজমেন্ট রিলোকেশন এবং সম্ভাব্য একীভূতকরণের (Merger) পরিকল্পনাও রয়েছে।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ SOBs-এর মূল সমস্যা। পুনর্গঠন তখনই সফল হবে যখন উচ্চস্তরের নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে ব্যাংকগুলোকে আইনগত ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা দেওয়া হবে।

৩. অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (AQR) ও দুর্নীতির তদন্ত

সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় ধরনের AQR শুরু করেছে এবং বড় চুরির/অনিয়মের অনুসন্ধান করতে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা সংস্থা (Big Four)-কে নিয়োগ করেছে। এর লক্ষ্য হলো আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সম্পদ-অপসারণের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: AQR-এর সত্যিকারের সাফল্য নির্ভর করে অনুসন্ধানের ফলাফল অনুযায়ী প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারের ওপর। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

৪. নন-পারফর্মিং লোন (NPL) সংকট ও প্রতিকার

২০২৪-২৫ সময়ে NPL-এর উচ্চ হার বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি মৌলিক বিপদ সংকেত। দুর্বল ক্রেডিট মূল্যায়ন, প্রভিশনিংয়ের ঘাটতি এবং ‘সংबंधित পক্ষের লেনদেন’ (related-party lending) NPL বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। NPL নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতিমালা, রেগুলেটরি রিক্যাপিটালাইজেশন এবং দেউলিয়া-কাঠামো উন্নয়ন অপরিহার্য।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: NPL-এর সমাধান কেবল অ্যাকাউন্টিংয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর ঋণদানের নতুন সংস্কৃতি, শক্তিশালী ক্রেডিট মূল্যায়ন এবং আইনগত দেউলিয়া কাঠামোর বিকাশের মাধ্যমে অর্জন করতে হবে।

৫. ডিজিটাল ব্যাংকিং: সুযোগ ও ঝুঁকি

ডিজিটাল ব্যাংক ও মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)-এর (যেমন বিকাশ, নগদ) দ্রুত প্রসার আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গতি এনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংক গাইডলাইন প্রকাশ এবং পেমেন্ট আইন আপডেট করছে। সুবিধা হলো: কম খরচে গ্রামীণ অন্তর্ভুক্তি ও উদ্ভাবনী পণ্য।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার সিকিউরিটি, ডাটা প্রাইভেসি এবং AML/CFT (অর্থ পাচার/সন্ত্রাস অর্থায়ন প্রতিরোধ) ঝুঁকিও বাড়ছে। কঠোর KYC, টেকনিক্যাল অডিটকমপ্লায়েন্স মনিটরিং ছাড়া ‘Shell company sponsorship’-এর মতো সিস্টেমিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

৬. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট

একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনগত স্বাধীনতা অত্যাবশ্যক। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তদারকি পদক্ষেপকে দুর্বল বা পক্ষপাতদুষ্ট করতে পারে। একইভাবে, সুদৃঢ় ডিপোজিট প্রটেকশন ফান্ড এবং ব্যাংক রেজল্যুশন ক্ষমতা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ-প্রক্রিয়ার জবাবদিহিবাজেট স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এর আইনগত স্বাধীনতাকে জোরদার করা উচিত। অন্যদিকে, রেজল্যুশন ফ্রেমওয়ার্ক কার্যকর করতে ত্বরিত বাস্তবায়ন দক্ষতা দরকার, যাতে তারল্য সরবরাহে দেরি হয়ে কোনো ধরনের পদ্ধতিগত ঝুঁকি (Systemic contagion) তৈরি না হয়।

৭. সুপারিশ: টেকসই সংস্কারের কৌশল

সংস্কার কার্যক্রমকে টেকসই করতে নিম্নোক্ত কৌশলগত ও বাস্তবায়নমূলক সুপারিশগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য:

  • ক. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা শক্ত করা: নিয়োগ, বাজেট ও নীতিগত স্বাধীনতা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা।
  • খ. SOBs-এর রূপান্তর পরিকল্পনায় রাজনৈতিক নিরাপত্তা: ম্যানেজমেন্টের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের জন্য আইনগত গ্যারান্টি প্রদান।
  • গ. AQR ও তদন্তের ফলাফল দ্রুত প্রকাশ: দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের কার্যকর কৌশল বাস্তবায়ন।
  • ঘ. ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সিং ও AML/CFT-এর কঠোর বাস্তবায়ন: Shell company ঝুঁকি বন্ধ করতে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া কঠোর করা।
  • ঙ. মানবসম্পদ ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ: নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংকগুলোকে আধুনিক মনিটরিং টুল, সাইবার-রেসিলিয়েন্স এবং প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করা।

বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক সমর্থন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনের কারণে সংস্কারের এক সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছে। এই সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দৃঢ়তা, নীতি-বাস্তবায়ন ক্ষমতা, আদালতনির্ভর জবাবদিহি এবং দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর।

 

ট্যাগ :
জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে আয়ারল্যান্ডের বিশাল সংগ্রহ, টেক্টরের বিধ্বংসী ইনিংস

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা অপরিহার্য

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংস্কার: আন্তর্জাতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ও টেকসই সমাধানের রূপরেখা

প্রকাশিত : ১০:৪৭:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৫

গত এক যুগে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত দ্রুত বিস্তার লাভ করলেও নন-পারফর্মিং লোন (NPL), দুর্নীতি এবং দুর্বল তদারকির মতো অতীতের গঠনগত দুর্বলতার কারণে এর স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ২০২৩-২৫ সময়কালে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক (BB) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন আইএমএফ (IMF), বিশ্বব্যাংকএডিবি (ADB)-এর পরামর্শে খাতটিকে স্থিতিশীল, প্রযুক্তিনির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ নীতিগত ও সাংগঠনিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে মুদ্রানীতি, তদারকি কাঠামো, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্তাবলি চালিত করছে।

১. আন্তর্জাতিক চাপ ও যোগ (IMF-এর ভূমিকা)

২০১৯ থেকে ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশ আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। এই তহবিল ছাড়ের শর্ত হিসেবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দ্রুত রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, মুদ্রানীতিগত শাসন এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য কাঠামোগত সংস্কারের দিকে মনোযোগ দিতে হয়েছে।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: আন্তর্জাতিক শর্তাদি মানা জরুরি হলেও, স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতাপ্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় না নিলে নীতিগুলো কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। শর্ত বাস্তবায়নের জন্য ধারাবাহিক, স্বচ্ছ ও গৃহীত রোডম্যাপ অত্যাবশ্যক।

২. রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের (SOBs) সংস্কার ও পুনর্গঠন

দীর্ঘদিন ধরে SOBs-এর দুর্বলতা ব্যাংকিং খাতের সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রস্তাবিত সংস্কার প্যাকেজে SOBs-এর পুনর্গঠনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন ফ্রেমওয়ার্ক, ম্যানেজমেন্ট রিলোকেশন এবং সম্ভাব্য একীভূতকরণের (Merger) পরিকল্পনাও রয়েছে।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ SOBs-এর মূল সমস্যা। পুনর্গঠন তখনই সফল হবে যখন উচ্চস্তরের নিয়োগ ও প্রশাসনিক কাঠামোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে ব্যাংকগুলোকে আইনগত ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা দেওয়া হবে।

৩. অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ (AQR) ও দুর্নীতির তদন্ত

সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় ধরনের AQR শুরু করেছে এবং বড় চুরির/অনিয়মের অনুসন্ধান করতে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা সংস্থা (Big Four)-কে নিয়োগ করেছে। এর লক্ষ্য হলো আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং সম্পদ-অপসারণের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: AQR-এর সত্যিকারের সাফল্য নির্ভর করে অনুসন্ধানের ফলাফল অনুযায়ী প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারের ওপর। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।

৪. নন-পারফর্মিং লোন (NPL) সংকট ও প্রতিকার

২০২৪-২৫ সময়ে NPL-এর উচ্চ হার বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি মৌলিক বিপদ সংকেত। দুর্বল ক্রেডিট মূল্যায়ন, প্রভিশনিংয়ের ঘাটতি এবং ‘সংबंधित পক্ষের লেনদেন’ (related-party lending) NPL বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। NPL নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতিমালা, রেগুলেটরি রিক্যাপিটালাইজেশন এবং দেউলিয়া-কাঠামো উন্নয়ন অপরিহার্য।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: NPL-এর সমাধান কেবল অ্যাকাউন্টিংয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর ঋণদানের নতুন সংস্কৃতি, শক্তিশালী ক্রেডিট মূল্যায়ন এবং আইনগত দেউলিয়া কাঠামোর বিকাশের মাধ্যমে অর্জন করতে হবে।

৫. ডিজিটাল ব্যাংকিং: সুযোগ ও ঝুঁকি

ডিজিটাল ব্যাংক ও মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)-এর (যেমন বিকাশ, নগদ) দ্রুত প্রসার আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গতি এনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংক গাইডলাইন প্রকাশ এবং পেমেন্ট আইন আপডেট করছে। সুবিধা হলো: কম খরচে গ্রামীণ অন্তর্ভুক্তি ও উদ্ভাবনী পণ্য।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার সিকিউরিটি, ডাটা প্রাইভেসি এবং AML/CFT (অর্থ পাচার/সন্ত্রাস অর্থায়ন প্রতিরোধ) ঝুঁকিও বাড়ছে। কঠোর KYC, টেকনিক্যাল অডিটকমপ্লায়েন্স মনিটরিং ছাড়া ‘Shell company sponsorship’-এর মতো সিস্টেমিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

৬. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট

একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনগত স্বাধীনতা অত্যাবশ্যক। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ তদারকি পদক্ষেপকে দুর্বল বা পক্ষপাতদুষ্ট করতে পারে। একইভাবে, সুদৃঢ় ডিপোজিট প্রটেকশন ফান্ড এবং ব্যাংক রেজল্যুশন ক্ষমতা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ।

  • সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ-প্রক্রিয়ার জবাবদিহিবাজেট স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এর আইনগত স্বাধীনতাকে জোরদার করা উচিত। অন্যদিকে, রেজল্যুশন ফ্রেমওয়ার্ক কার্যকর করতে ত্বরিত বাস্তবায়ন দক্ষতা দরকার, যাতে তারল্য সরবরাহে দেরি হয়ে কোনো ধরনের পদ্ধতিগত ঝুঁকি (Systemic contagion) তৈরি না হয়।

৭. সুপারিশ: টেকসই সংস্কারের কৌশল

সংস্কার কার্যক্রমকে টেকসই করতে নিম্নোক্ত কৌশলগত ও বাস্তবায়নমূলক সুপারিশগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য:

  • ক. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা শক্ত করা: নিয়োগ, বাজেট ও নীতিগত স্বাধীনতা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা।
  • খ. SOBs-এর রূপান্তর পরিকল্পনায় রাজনৈতিক নিরাপত্তা: ম্যানেজমেন্টের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের জন্য আইনগত গ্যারান্টি প্রদান।
  • গ. AQR ও তদন্তের ফলাফল দ্রুত প্রকাশ: দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারের কার্যকর কৌশল বাস্তবায়ন।
  • ঘ. ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সিং ও AML/CFT-এর কঠোর বাস্তবায়ন: Shell company ঝুঁকি বন্ধ করতে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া কঠোর করা।
  • ঙ. মানবসম্পদ ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ: নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংকগুলোকে আধুনিক মনিটরিং টুল, সাইবার-রেসিলিয়েন্স এবং প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করা।

বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক সমর্থন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ এবং ডিজিটাল উদ্ভাবনের কারণে সংস্কারের এক সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছে। এই সফলতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দৃঢ়তা, নীতি-বাস্তবায়ন ক্ষমতা, আদালতনির্ভর জবাবদিহি এবং দক্ষ প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর।