বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে পাওনা ঋণের বোঝা ও ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের অভাব—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। যদিও পরিসংখ্যানে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে তার সুফল এখনো পৌঁছাতে শুরু করেনি।
সরকারি হিসাবে ২০২৫ সালের নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশে নেমে আসা একটি স্বস্তির খবর হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে তা ভিন্ন। এর প্রধান কারণ হলো মজুরি প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা (৮.০৪ শতাংশ)। যখন মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। চাল, ডাল, সবজি ও যাতায়াত খরচের পেছনে আয়ের বড় অংশ ব্যয় হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সঞ্চয় তো দূরের কথা, প্রতিদিনের পুষ্টি চাহিদাও মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি এখন ব্যাংকিং খাত। সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। এই বিশাল অংকের অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। বড় বড় শিল্প গ্রুপকে দেওয়া বিশেষ সুবিধা বা পুনঃতফসিল করার ফলেও খেলাপি ঋণের রাশ টানা সম্ভব হয়নি, যা সাধারণ আমানতকারীদের মনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধা এখন এক বড় ঝুঁকিতে। ১৫-২৯ বছর বয়সি তরুণদের একটি বিশাল অংশ (প্রায় ২০%) শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের বাইরে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না, ফলে স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। তরুণরা এখন খণ্ডকালীন বা অনানুষ্ঠানিক কাজের দিকে ঝুঁকছে, যা দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের ফলে বৈদেশিক খাতে কিছুটা প্রাণ ফিরে এসেছে। ডিসেম্বর ২০২৫-এ রিজার্ভ বেড়ে ২৭.৮৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো অর্থনীতিতে কিছুটা ভারসাম্য এনেছে। রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) উচ্চ প্রবৃদ্ধি রিজার্ভকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করলেও, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের স্থবিরতা প্রবৃদ্ধিকে আশানুরূপ পর্যায়ে নিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছে।
সিপিডি ও ঢাকা চেম্বারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ৬.২৩ শতাংশে নেমে আসা এটাই নির্দেশ করে যে, ব্যবসায়ীরা নতুন উদ্যোগে যাওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। উচ্চ সুদের হার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। রিজার্ভের উন্নতি ও কিছু কাঠামোগত সংস্কার শুরু হলেও, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা না ফিরলে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আসবে না। টেকসই অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 










