০৩:৩৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫

ময়মনসিংহের শিক্ষার্থী ও কোচিং বাণিজ্য: মানসিক চাপ ও শারীরিক ধকল

ময়মনসিংহ শহরে কোচিং বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসারের ফলে শিক্ষার্থীরা এক ধরনের তীব্র ‘ত্রিমুখী চাপে’ (স্কুল/কলেজ, কোচিং এবং প্রাইভেট টিউটর) আটকা পড়ছে। এই অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছে।

😟 মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

কোচিং বাণিজ্যের কারণে শিক্ষার্থীরা নিম্নলিখিত মানসিক চাপের শিকার হচ্ছে:

  • অত্যধিক একাডেমিক চাপ ও উদ্বেগ:
    • শিক্ষার্থীদের প্রায় সারাদিনই পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। স্কুল/কলেজের পর কোচিং, এরপর বাড়ির কাজ এবং প্রাইভেট পড়ার কারণে বিশ্রাম বা বিনোদনের সময় থাকছে না।
    • কোচিংয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা এবং বারবার ফলাফলের তুলনার কারণে তাদের মধ্যে অসহনীয় উদ্বেগের সৃষ্টি হচ্ছে।
    • সবসময় ভালো ফল করার চাপ তাদের মধ্যে ভয় ও হতাশা বাড়াচ্ছে।
  • সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব:
    • কোচিংগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট ছক এবং নোট মুখস্থ করার ওপর জোর দেয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি, প্রশ্ন করার প্রবণতা এবং সৃজনশীলতা কমে যাচ্ছে।
    • নিজেদের ভুল থেকে শেখার সুযোগ কম থাকায় তারা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে এবং কোনো সমস্যার নিজস্ব সমাধান খোঁজার আগ্রহ হারায়।
  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও বিষণ্নতা:
    • অতিরিক্ত পড়াশোনার কারণে শিক্ষার্থীরা খেলতে যাওয়ার, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সময় কাটানোর বা পারিবারিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে না।
    • এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একঘেয়ে রুটিন অনেক সময় তাদের মধ্যে বিষণ্নতা (Depression) বা মানসিক শূন্যতা তৈরি করছে।
  • পেশাগত লক্ষ্যের স্পষ্টতার অভাব:
    • কোচিংগুলো নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে ভালো ফলাফলকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দেখায়, ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাস্তব আগ্রহ, মেধা ও ভবিষ্যতের পেশাগত লক্ষ্য নির্ধারণে বিভ্রান্ত হয়।

💪 শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

সারা দিন ধরে একটানা পড়াশোনা এবং অনিয়মিত রুটিন শিক্ষার্থীদের শারীরিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে:

  • অনিদ্রা ও ক্লান্তি:
    • রাত জেগে পড়া বা সকালে কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য খুব ভোরে ওঠার কারণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত হয়।
    • দীর্ঘমেয়াদী অনিদ্রা এবং ক্লান্তি তাদের মনোযোগ হ্রাস করে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।
  • দৃষ্টিশক্তির সমস্যা:
    • টানা বই পড়া এবং ক্লাসে থাকার কারণে চোখে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা দ্রুত দৃষ্টিশক্তির সমস্যা তৈরি করছে।
  • শারীরিক স্থবিরতা ও স্থূলতা:
    • শারীরিক কার্যকলাপ (যেমন খেলাধুলা) না থাকায় তারা শারীরিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ছে।
    • শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে অনেক শিশু-কিশোরের মধ্যে স্থূলতা (Obesity) এবং এর সাথে সম্পর্কিত স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
  • মাথাব্যথা ও হজমের সমস্যা:
    • মানসিক চাপ ও একটানা পড়াশোনার কারণে মাথাব্যথা একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
    • সময়মতো বা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার না খাওয়ার কারণে হজম সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায়ও তারা ভুগছে।

🚀 উত্তরণের পথ

শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ময়মনসিংহের অভিভাবকদের এবং শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রকদের যৌথভাবে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নিতে হবে:

  1. সময়সূচি শিথিল করা: শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্রাম, বিনোদন এবং খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত সময় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রুটিন তৈরি করা।
  2. স্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে উৎসাহিত করা: অভিভাবকদের উচিত শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য এবং দৈনিক কিছু শারীরিক কার্যকলাপ নিশ্চিত করা।
  3. স্কুল-ভিত্তিক কাউন্সেলিং: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং সেবা চালু করা, যাতে শিক্ষার্থীরা চাপমুক্ত থাকতে পারে এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নিতে পারে।
  4. কোচিং-মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা: দীর্ঘমেয়াদে, কোচিং বাণিজ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এনে মূল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।

শিক্ষার লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় পাশ করা নয়, বরং একটি সুস্থ ও সক্ষম প্রজন্ম তৈরি করা। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমানো এবং তাদের সুস্থ মানসিক ও শারীরিক বিকাশের সুযোগ তৈরি করা অপরিহার্য।

জনপ্রিয়

চট্টগ্রামে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে আয়ারল্যান্ডের বিশাল সংগ্রহ, টেক্টরের বিধ্বংসী ইনিংস

ময়মনসিংহের শিক্ষার্থী ও কোচিং বাণিজ্য: মানসিক চাপ ও শারীরিক ধকল

প্রকাশিত : ০২:০৯:০৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর ২০২৫

ময়মনসিংহ শহরে কোচিং বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসারের ফলে শিক্ষার্থীরা এক ধরনের তীব্র ‘ত্রিমুখী চাপে’ (স্কুল/কলেজ, কোচিং এবং প্রাইভেট টিউটর) আটকা পড়ছে। এই অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করছে।

😟 মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

কোচিং বাণিজ্যের কারণে শিক্ষার্থীরা নিম্নলিখিত মানসিক চাপের শিকার হচ্ছে:

  • অত্যধিক একাডেমিক চাপ ও উদ্বেগ:
    • শিক্ষার্থীদের প্রায় সারাদিনই পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। স্কুল/কলেজের পর কোচিং, এরপর বাড়ির কাজ এবং প্রাইভেট পড়ার কারণে বিশ্রাম বা বিনোদনের সময় থাকছে না।
    • কোচিংয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষা এবং বারবার ফলাফলের তুলনার কারণে তাদের মধ্যে অসহনীয় উদ্বেগের সৃষ্টি হচ্ছে।
    • সবসময় ভালো ফল করার চাপ তাদের মধ্যে ভয় ও হতাশা বাড়াচ্ছে।
  • সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব:
    • কোচিংগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট ছক এবং নোট মুখস্থ করার ওপর জোর দেয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি, প্রশ্ন করার প্রবণতা এবং সৃজনশীলতা কমে যাচ্ছে।
    • নিজেদের ভুল থেকে শেখার সুযোগ কম থাকায় তারা আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে এবং কোনো সমস্যার নিজস্ব সমাধান খোঁজার আগ্রহ হারায়।
  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও বিষণ্নতা:
    • অতিরিক্ত পড়াশোনার কারণে শিক্ষার্থীরা খেলতে যাওয়ার, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সময় কাটানোর বা পারিবারিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে না।
    • এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একঘেয়ে রুটিন অনেক সময় তাদের মধ্যে বিষণ্নতা (Depression) বা মানসিক শূন্যতা তৈরি করছে।
  • পেশাগত লক্ষ্যের স্পষ্টতার অভাব:
    • কোচিংগুলো নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে ভালো ফলাফলকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দেখায়, ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাস্তব আগ্রহ, মেধা ও ভবিষ্যতের পেশাগত লক্ষ্য নির্ধারণে বিভ্রান্ত হয়।

💪 শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

সারা দিন ধরে একটানা পড়াশোনা এবং অনিয়মিত রুটিন শিক্ষার্থীদের শারীরিক স্বাস্থ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে:

  • অনিদ্রা ও ক্লান্তি:
    • রাত জেগে পড়া বা সকালে কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য খুব ভোরে ওঠার কারণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত হয়।
    • দীর্ঘমেয়াদী অনিদ্রা এবং ক্লান্তি তাদের মনোযোগ হ্রাস করে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।
  • দৃষ্টিশক্তির সমস্যা:
    • টানা বই পড়া এবং ক্লাসে থাকার কারণে চোখে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা দ্রুত দৃষ্টিশক্তির সমস্যা তৈরি করছে।
  • শারীরিক স্থবিরতা ও স্থূলতা:
    • শারীরিক কার্যকলাপ (যেমন খেলাধুলা) না থাকায় তারা শারীরিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ছে।
    • শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে অনেক শিশু-কিশোরের মধ্যে স্থূলতা (Obesity) এবং এর সাথে সম্পর্কিত স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
  • মাথাব্যথা ও হজমের সমস্যা:
    • মানসিক চাপ ও একটানা পড়াশোনার কারণে মাথাব্যথা একটি সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
    • সময়মতো বা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার না খাওয়ার কারণে হজম সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায়ও তারা ভুগছে।

🚀 উত্তরণের পথ

শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ময়মনসিংহের অভিভাবকদের এবং শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রকদের যৌথভাবে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নিতে হবে:

  1. সময়সূচি শিথিল করা: শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্রাম, বিনোদন এবং খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত সময় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ রুটিন তৈরি করা।
  2. স্বাস্থ্যকর অভ্যাসকে উৎসাহিত করা: অভিভাবকদের উচিত শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য এবং দৈনিক কিছু শারীরিক কার্যকলাপ নিশ্চিত করা।
  3. স্কুল-ভিত্তিক কাউন্সেলিং: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং সেবা চালু করা, যাতে শিক্ষার্থীরা চাপমুক্ত থাকতে পারে এবং প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা নিতে পারে।
  4. কোচিং-মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা: দীর্ঘমেয়াদে, কোচিং বাণিজ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এনে মূল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই শিক্ষার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।

শিক্ষার লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় পাশ করা নয়, বরং একটি সুস্থ ও সক্ষম প্রজন্ম তৈরি করা। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমানো এবং তাদের সুস্থ মানসিক ও শারীরিক বিকাশের সুযোগ তৈরি করা অপরিহার্য।